শিখ নেতা হত্যাকাণ্ডে ভারতীয় অপরাধচক্রের হোতাসহ ৩৭ জনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ গঠন

কানাডায় শিখ নেতা হারদীপ সিং নিজ্জার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগে এক ভারতীয় অপরাধী চক্রের নেতার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করেছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ। এই ঘটনা ভারত ও কানাডার মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কে যে গভীর সংকটের সৃষ্টি করেছিল, তা মার্কিন বিচার বিভাগীয় এই পদক্ষেপের পর নতুন মোড় নিল। ক্যালিফোর্নিয়ার কেন্দ্রীয় জেলার অ্যাটর্নি বিল এসাইলি মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, তিন আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রের ৩৭ সদস্যের বিরুদ্ধে এই সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর যৌথ অভিযানে এই চক্রের সদস্যদের চিহ্নিত করা হয়েছে। অপরাধী চক্রগুলোর বিরুদ্ধে অপহরণ, চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা, মাদক পাচার এবং হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মামলার প্রেক্ষিতে এখনো সাতজন পলাতক আসামিকে যুক্তরাষ্ট্রে, দুজনকে ভারতে এবং একজনকে ইউরোপে হন্যে হয়ে খুঁজছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
এফবিআইয়ের লস এঞ্জেলেস ফিল্ড অফিসের সহকারী পরিচালক প্যাট্রিক গ্র্যান্ডি জানান, এই অপরাধী গোষ্ঠীগুলো ক্যালিফোর্নিয়া ও এর বাইরে ভারতীয় বংশোদ্ভূত সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। অভিযুক্তদের মধ্যে ৩৩ বছর বয়সী লরেন্স বিষ্ণোই এবং তার সহযোগী সতীন্দরের সিংয়ের বিরুদ্ধে ২০২৩ সালে কানাডার একটি মন্দিরের বাইরে শিখ নেতা হারদীপ সিং নিজ্জারকে গুলি করে হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে বিষ্ণোই কারাবন্দী থাকলেও তার সহযোগী এখনো পলাতক।
নিজ্জার হত্যাকাণ্ডের পর কানাডার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো দাবি করেছিলেন যে, হত্যাকাণ্ডের পেছনে ভারত সরকারের সংশ্লিষ্টতার বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ রয়েছে। এই ঘটনা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে চরম উত্তেজনা তৈরি করে এবং উভয় দেশ একে অপরের কূটনীতিকদের বহিষ্কার করে। ৪৫ বছর বয়সী নিজ্জার ভারতে জন্মগ্রহণ করলেও কানাডার নাগরিক ছিলেন এবং শিখদের জন্য স্বাধীন ‘খালিস্তান’ রাষ্ট্র গঠনের আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন। ভারত সরকার তাকে সে সময় ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে তার ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেছিল।
মার্কিন প্রসিকিউটরদের ভাষ্যমতে, বিষ্ণোইয়ের অপরাধী চক্রটি মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতাদের ওপর সহিংস হামলা চালাত। তদন্তে আরও উঠে এসেছে যে, কিছু অভিযুক্ত ভারতের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ রেখে তাদের প্রতিপক্ষ বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোপন তথ্যদাতাদের দমন করত। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক বিভাগের কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায়ও একজন আসামি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে নথিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিল এসাইলি এই সাফল্যকে আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সমন্বয়ের এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, অপরাধী গোষ্ঠীগুলো পৃথিবীর যেখানেই সক্রিয় থাকুক না কেন, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপ ও এশিয়ার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের সমূলে নির্মূল করতে বদ্ধপরিকর। লরেন্স বিষ্ণোইয়ের আইনজীবীর সঙ্গে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা