ইসরায়েল-লেবানন যুদ্ধবিরতি চুক্তি যুদ্ধের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ রুদ্ধ করছে বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উদ্বেগ

লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে স্বাক্ষরিত সাম্প্রতিক কাঠামোগত চুক্তিটি যুদ্ধাপরাধের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারকে নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেছে ছয়টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও সংবাদমাধ্যম অধিকার রক্ষা সংস্থা। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, লেবানিজ সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস, লিগ্যাল এজেন্ডা, রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস এবং ইউনিয়ন অব জার্নালিস্ট ইন লেবানন যৌথ বিবৃতিতে এই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাগুলোর মতে, মার্কিন মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত এই চুক্তির কয়েকটি ধারা আন্তর্জাতিক আদালতে ন্যায়বিচার প্রার্থনার পথ রুদ্ধ করার অপপ্রয়াস।

বিজ্ঞাপন

গত ২৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির ৩ ও ১৩ নম্বর ধারা নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। তাদের ভাষ্যমতে, এই ধারাগুলো লেবানন ও ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত কিংবা আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতের দ্বারস্থ হওয়া থেকে বিরত রাখবে। বিশেষ করে ৩ নম্বর ধারাটি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে, যেখানে সীমান্তে বসবাসকারী নাগরিকদের ফিরে আসার সুযোগকে অনিয়ন্ত্রিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিরস্ত্রীকরণের শর্তের সাথে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী, শত্রুতা অবসানের সাথে সাথেই বেসামরিক নাগরিকদের নিজ বসতভিটায় ফেরার অধিকার রয়েছে, যা এই চুক্তিতে অবহেলিত হয়েছে।

চুক্তির ১৩ নম্বর ধারাটি বেসামরিক নাগরিকদের আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বা আইনি ফোরামে অভিযোগ দায়ের থেকে বিরত রাখে। অথচ গত মার্চ থেকে চলা সংঘাতের ফলে লেবাননে অন্তত ৪ হাজার ৩০০ মানুষ নিহত এবং ১২ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছে। বাস্তুচ্যুত হয়েছে কয়েক লক্ষ মানুষ। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, যে চুক্তি ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতার ভিত্তিকে উপেক্ষা করে, তা কেবল দায়মুক্তির সংস্কৃতিকেই ত্বরান্বিত করবে। লিগ্যাল এজেন্ডার লিটিগেশন প্রধান গিদা ফ্রাঙ্গিহ যোগ করেন, আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায়বিচারের দাবি কোনো দরকষাকষির বিষয় হতে পারে না।

তবে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এই চুক্তির পক্ষেই সাফাই গেয়েছেন। প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের ভাষ্যমতে, এই চুক্তি ইসরায়েলি দখলদারিত্বকে বৈধতা দেয় না, বরং লেবানিজ সেনাবাহিনীকে নিজ দেশের ভূখণ্ডে কর্তৃত্ব বিস্তারে শক্তিশালী করবে। তিনি দাবি করেন, ইসরায়েলি বাহিনী সরে যাওয়ার পর দক্ষিণ লেবাননের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী পূর্ণ দায়িত্ব পালন করবে। যদিও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, হিজবুল্লাহ হুমকি হিসেবে টিকে থাকা পর্যন্ত তাদের সামরিক উপস্থিতি বজায় থাকবে।

বিজ্ঞাপন

এদিকে ২১ জুন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি এবং ২৬ জুনের এই কাঠামোগত চুক্তির পর বাস্তুচ্যুত লেবানিজ নাগরিকদের ঘরে ফেরার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন বা আইওএম-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৬ লক্ষ ৪৬ হাজার ১০৭ জন অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি তাদের এলাকায় ফিরতে শুরু করেছেন। তবে এখনো প্রায় ৫ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। দক্ষিণ লেবাননের সীমান্তবর্তী অনেক গ্রাম ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের ফেরার জায়গা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

0%
0%
0%
0%