ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের ওপর ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা অকার্যকর ও লোক দেখানো বলে সমালোচনা

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং এতে রাষ্ট্রীয় মদদের বিষয়টি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞায় যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন মানবাধিকার কর্মীরা। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইসরায়েলের বসতি স্থাপনকারী চারটি গোষ্ঠী এবং তিন ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও, আক্রান্ত ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বা বসতি বিস্তারের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা রুখতে এসব পদক্ষেপ ব্যর্থ হয়েছে। উল্টো নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়া ব্যক্তিদের অনেকেই একে ‘সম্মানের পদক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যা প্রমাণ করে আন্তর্জাতিক চাপের কার্যকারিতা নিয়ে গভীর সংকট রয়েছে।

নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা ‘রেগাভিম’ নামক সংগঠনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোতরিচ এবং বসতি স্থাপনকারী নেতা ড্যানিয়েলা ওয়েইসের মতো ব্যক্তিরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই সিদ্ধান্তকে হাস্যকর বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ধরনের নামমাত্র নিষেধাজ্ঞা বসতি স্থাপনকারীদের দৌরাত্ম্য কমাতে কোনো প্রভাব ফেলবে না, কারণ তারা সাধারণত আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ওপর নির্ভরশীল নন। বরং এই কঠোরপন্থী গোষ্ঠীগুলো অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নিজেদের প্রভাব আরও সুসংহত করার সুযোগ পাচ্ছে এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পশ্চিম তীরে সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে।

আল হকের উপ-পরিচালক তাহসিন আলায়ান জানান, ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এখন বসতি স্থাপনকারীরা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী এবং তারা ফিলিস্তিনিদের জনবহুল গ্রামগুলোতে ঢুকে ঘরবাড়ি পোড়ানো, গাড়ি ধ্বংস এবং গবাদি পশু লুটের মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে। জাতিসংঘের তথ্য ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলা ও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার শিকার হয়ে ১ হাজার ১৬৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১২ হাজার ৬৬৬ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে প্রায় ৩৩ হাজার ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং ২৩ হাজার মানুষকে বিনা অভিযোগে বন্দি করা হয়েছে।

মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এই সহিংসতা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং এটি ইসরায়েলি সরকারের একটি সুপরিকল্পিত নীতির প্রতিফলন। দেশটির অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোতরিচ এবং নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের মতো কট্টরপন্থীরা মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়ার ফলে বসতি স্থাপনকারীদের অপরাধের ক্ষেত্রে এক ধরনের দায়মুক্তির সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা বি’সেলেম-এর শাই পার্নেস স্পষ্ট করেছেন যে, ফিলিস্তিনিদের ওপর দমন-পীড়নের পেছনে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সমর্থন রয়েছে, যা মূলত ইহুদি শ্রেষ্ঠত্ববাদের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছে।

সমাজবিজ্ঞানী ইহুদা শেনহাভ-শাহরাবানি এই পরিস্থিতিকে একটি ‘বদ্ধ চক্র’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, যেখানে বসতি স্থাপনকারীরা একইসঙ্গে অস্ত্রধারী সেনা এবং ধর্মীয় উগ্রবাদে বিশ্বাসী, সেখানে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা একপ্রকার অনিবার্য হয়ে পড়েছে। সরকার, সেনাবাহিনী এবং বসতি স্থাপনকারীদের এই ত্রিভুজ মৈত্রী এবং বাইবেলের দোহাই দিয়ে ভূমি দখলের পরিকল্পনা—সব মিলিয়ে পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের জন্য এক গভীর মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হওয়ায় বসতি স্থাপনকারীদের এই সহিংস চক্র আরও শক্তিশালী হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

০%
০%
০%
০%