ফিলিস্তিনে যুদ্ধের মধ্যেই ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা খাতের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২.৭ বিলিয়ন ইউরো বাণিজ্য

গাজা ভূখণ্ড ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনীর দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধাপরাধ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ সত্ত্বেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলো তেল আবিবের সাথে বিলিয়ন বিলিয়ন ইউরোর বাণিজ্যিক চুক্তি অব্যাহত রেখেছে। আল জাজিরার হাতে আসা ‘স্টেটওয়াচ’-এর তথ্যে উঠে এসেছে যে, গত ৪২ মাসে ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সরকারি প্রতিষ্ঠান ইসরায়েলি কোম্পানিগুলোর সাথে অন্তত ২.৭ বিলিয়ন ইউরো বা প্রায় ৩.১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ১৯৪টি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিজে-তে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলা চলমান থাকা এবং আদালত কর্তৃক ফিলিস্তিনিদের রক্ষায় কঠোর নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও এই বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখা নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর এই বাণিজ্যের গতি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত যে গতিতে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যুদ্ধের পরের ২১ মাসে তা আরও ত্বরান্বিত হয়েছে। যুদ্ধের এই সময়ে ১.৬ বিলিয়ন ইউরো বা ১.৮ বিলিয়ন ডলারের ১১২টি নতুন চুক্তি সই হয়েছে। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে হাঙ্গেরি ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় সহযোগী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যারা ৬০৩ মিলিয়ন ইউরো বা ৬৮৪ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ৪২টি চুক্তি সম্পন্ন করেছে।
মজার ব্যাপার হলো, স্পেন ও সুইডেনের মতো দেশগুলো—যারা কূটনৈতিক পর্যায়ে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে আসছে—তারাও ইসরায়েলি সামরিক সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি ক্রয়ে পিছিয়ে নেই। স্পেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ২০২৪ সালের এপ্রিলে রাফায়েল নামক ইসরায়েলি কোম্পানির সাথে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংক্রান্ত ২০৭ মিলিয়ন ইউরো বা ২৩৫ মিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল চুক্তি করেছে। এছাড়া দেশটির পুলিশ বাহিনী ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠান মারম ডলফিন থেকে বুলেটপ্রুফ ভেস্ট ক্রয় করেছে। একইভাবে ইতালি ও জার্মানিও ইসরায়েলি সামরিক প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা সরঞ্জামের অন্যতম বড় ক্রেতা।
আইন বিশেষজ্ঞরা এই বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডকে আন্তর্জাতিক আইনের সাথে সাংঘর্ষিক বলে অভিহিত করেছেন। ভিয়েনার সেন্ট্রাল ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ইউসেফ আল তামিমির মতে, আইসিজে-এর নির্দেশনার পর ইসরায়েলের সাথে এমন বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখা আইনত অগ্রহণযোগ্য। তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ফিলিস্তিনের অবৈধ দখলদারিত্ব নিরসনে ব্যবস্থা নেওয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক, যা তারা ক্রমাগত উপেক্ষা করছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের কূটনৈতিক সেবার তথ্যেও উঠে এসেছে যে, ইসরায়েল আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘন করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র নীতি প্রধান কায়া কালাস ইসরায়েলের খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা বন্ধের মতো পদক্ষেপগুলোকে আত্মরক্ষার অধিকারের সীমা অতিক্রমকারী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো মানবাধিকার সংগঠনগুলো অবিলম্বে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে ইসরায়েলের অংশীদারিত্ব চুক্তি বাতিলের দাবি জানিয়েছে। তাদের দাবি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কেবল মৌখিক নিন্দা জানাচ্ছে, কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় ইসরায়েল কোনো প্রকার জবাবদিহিতা ছাড়াই তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
