হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সমঝোতা চুক্তির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

হরমোজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সামরিক উত্তজনা ছড়িয়ে পড়েছে, যা গত ১৫ জুন স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে পতনের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে। কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাত অবসানে দুই দেশ যে সমঝোতা স্মারকে সই করেছিল, তার শর্ত লঙ্ঘনের জন্য উভয় পক্ষ একে অপরকে দায়ী করছে। চলমান এই ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনে হরমোজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অস্থিরতা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন সংকটের আশঙ্কা তৈরি করেছে।

বিজ্ঞাপন

গত শুক্রবার রাতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, হরমোজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ‘শক্তিশালী জবাব’ হিসেবে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন রক্ষণাগার এবং রাডার স্থাপনায় বিমান হামলা চালানো হয়েছে। এর আগে বৃহস্পতিবার ওমানের উপকূলে সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী ‘এভার লাভলি’ নামক একটি বাণিজ্যিক জাহাজ অজ্ঞাত প্রক্ষেপকের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই হামলাকে যুদ্ধবিরতি চুক্তির ‘বোকামিপূর্ণ লঙ্ঘন’ হিসেবে অভিহিত করে ইরানকে দায়ী করেছেন।

অন্যদিকে তেহরান জানিয়েছে, ইরানের হোরমোজগান প্রদেশের সিরিক বন্দরের কাছে একটি প্রক্ষেপক আঘাত হেনেছে। মেহর নিউজ এজেন্সির তথ্যমতে, সিরিক বন্দরে কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি এবং বন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। তবে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী—আইআরজিসি—সতর্ক করে দিয়েছে যে, ভবিষ্যতে এ ধরনের আগ্রাসন চললে তারা আরও কঠোর ও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখাবে।

শনিবার বাহরাইনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও তাদের ভূখণ্ডে কথিত ইরানি ড্রোন হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। একই দিনে যুক্তরাজ্য মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস—ইউকেএমটিও—জানিয়েছে যে, অজ্ঞাত প্রক্ষেপকের আঘাতে একটি ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবে এতে কোনো নাবিক হতাহত হননি। হরমোজ প্রণালীকে কৌশলগত দাবার গুটি হিসেবে ব্যবহার করে ইরান দীর্ঘকাল ধরে সেখানে নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও জাহাজ চলাচলের ওপর শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা করে আসছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়েছে।

বিজ্ঞাপন

ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, ইরান ৬০ দিনের জন্য বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিশ্চয়তা দিতে রাজি হয়েছিল, তবে এরপরের পরিস্থিতি নিয়ে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, কোনোভাবেই ইরানকে প্রণালীতে টোল বা ফি আদায়ের অনুমতি দেওয়া হবে না। কুয়েন্সি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি সতর্ক করেছেন যে, নতুন এই সামরিক সংঘাত সমঝোতা স্মারকটিকে চরম চাপের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশই হরমোজ প্রণালীর ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব প্রমাণের মরিয়া প্রচেষ্টায় লিপ্ত। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে যে কোনো সময় সংঘাত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়াতে আগ্রহী বলে প্রতীয়মান হচ্ছে, তবুও চলমান এই সহিংসতা শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

0%
0%
0%
0%