হরমুজ প্রণালিতে মাইন অপসারণে জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান শুরু

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সাম্প্রতিক কাঠামোগত চুক্তির আওতায় হরমুজ প্রণালীতে ছড়িয়ে থাকা মাইন অপসারণের জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ শুরু হয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সংঘাতের অবসানে গত সপ্তাহে ওয়াশিংটন ও তেহরান এই সমঝোতায় পৌঁছায়। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান এই পথটি পুনরায় চালু করার শর্ত হিসেবে ইরানকে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে সমস্ত মাইন নিষ্ক্রিয় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বে জার্মানি, ইতালি, জাপান এবং কানাডার সমন্বয়ে একটি সম্মিলিত বাহিনী এই ডি-মাইনিং বা মাইন অপসারণ অভিযানে কাজ করছে।

বিজ্ঞাপন

বিশেষজ্ঞদের মতে, সামুদ্রিক মাইন অত্যন্ত কম খরচে তৈরি করা সম্ভব হলেও, এগুলো শনাক্ত ও অপসারণ করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ। পানির নিচে থাকা এই বিস্ফোরকগুলো সাধারণত কোনো জাহাজের চুম্বকীয়, শব্দ বা চাপের সংকেত শনাক্ত করে বিস্ফোরণ ঘটাতে সক্ষম। সমুদ্রের তলদেশে থাকা মাইনগুলো পাথরের সঙ্গে মিশে থাকায় এগুলো খুঁজে বের করা বেশ কষ্টসাধ্য। এ ছাড়া নোঙর করা মাইন পানির নিচে ভেসে থাকে এবং যেকোনো নৌযানের সংস্পর্শে এলেই তা ভয়াবহ রূপ ধারণ করে।

সবচেয়ে বিপজ্জনক হিসেবে পরিচিত ভাসমান মাইনগুলো কোনো নির্দিষ্ট স্থানে আটকে থাকে না, বরং জোয়ার-ভাটার সঙ্গে স্থান পরিবর্তন করতে থাকে। রয়টার্সের তথ্যানুসারে, হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথে এ ধরনের মাইন বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নৌ-বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, একটি মাত্র মাইন শনাক্ত করা যেমন কঠিন, একটি এলাকায় আর কোনো মাইন নেই—সেটি নিশ্চিত করা তার চেয়েও বেশি চ্যালেঞ্জিং।

মাইন অপসারণের এই প্রক্রিয়ায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার নিশ্চিত করছে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্র দেশগুলোর নৌবাহিনী। পানির তলদেশে স্ক্যান করার জন্য উন্নত সোলার-যুক্ত ড্রোন, রোবট এবং সেন্সর সমৃদ্ধ হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে সমুদ্রের তলদেশে থাকা আবর্জনা বা ধ্বংসাবশেষ অনেক সময় মাইনের মতো সংকেত দেওয়ায় অপারেটরদের অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে। মূলত নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ, বিশেষজ্ঞ ডুবুরি কিংবা রিমোট কন্ট্রোল প্রযুক্তির মাধ্যমে এসব বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয় করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

মাইন অপসারণের এই ধীরগতি ও উচ্চ ঝুঁকির কারণে হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচল স্বাভাবিক হতে আরও কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শিপিং কোম্পানি ও বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, যতক্ষণ না প্রতিটি লেন নিখুঁতভাবে তল্লাশি করে নিরাপদ ঘোষণা করা হচ্ছে, ততক্ষণ তারা পুরোপুরি ঝুঁকি মুক্ত হতে পারছে না। একটি বিশাল আকৃতির সুপারট্যাঙ্কার বা পণ্যবাহী জাহাজের মূল্য কোটি কোটি ডলার হওয়ায় সামান্যতম ঝুঁকিও বাণিজ্যের ওপর বড় প্রভাব ফেলছে। ফলে, ভূ-রাজনৈতিক সমঝোতা হলেও সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোকে দীর্ঘ সময় কঠোর নজরদারির মধ্যে থাকতে হবে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

0%
0%
0%
0%