ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে সংশয় ও নতুন সমীকরণ

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের অদূরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত নিরসনে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। দীর্ঘ কয়েক সপ্তাহ ধরে সমঝোতার ইঙ্গিত দেওয়ার পর অবশেষে বুধবার ১৪ দফা বিশিষ্ট এই কাঠামোগত চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন উভয় পক্ষ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তিকে বারাক ওবামার আমলে সম্পাদিত ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির চেয়েও অধিক কার্যকর বলে দাবি করেছেন। তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, ৬০ দিনের এই অন্তর্বর্তীকালীন আলোচনা প্রক্রিয়া আদতে আগের চুক্তির চেয়ে কতটা আলাদা হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন।

বিজ্ঞাপন

চুক্তি অনুযায়ী, তেহরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি বা সংগ্রহের কার্যক্রম থেকে বিরত থাকবে। এর বিনিময়ে তেহরানের ওপর থেকে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পুনর্গঠন পরিকল্পনা গ্রহণ এবং হরমুজ প্রণালীতে পুনরায় নৌ-চলাচল শুরুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। চ্যাথাম হাউসের সহযোগী ফেলো আনিসেহ বাসিরি তাবরিজি জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই দুই চুক্তির তুলনা করা যৌক্তিক নয়, কারণ এই সমঝোতা স্মারকটি মূলত যুদ্ধবিরতি দীর্ঘায়িত করার দিকেই বেশি নজর দিয়েছে। মেলবোর্নের ডেকিন ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক ফোরামের পরিচালক শাহরাম আকবরজাদেহ বলেন, এই স্মারকে মৌলিক কোনো বিষয়ের সুরাহা হয়নি।

ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আগের চুক্তিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের একটি নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু নতুন স্মারকে এ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট উল্লেখ নেই। এছাড়া ওবামার আমলের সেই চুক্তিতে চীন, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও জার্মানির মতো শক্তিধর দেশগুলোর অংশগ্রহণ এবং কঠোর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা ছিল, যা এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে অনুপস্থিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরমাণু অস্ত্র না বানানোর যে প্রতিশ্রুতি ইরান দিয়েছে, তা তাদের দীর্ঘদিনের পুরনো অবস্থান, নতুন কোনো অর্জন নয়। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-ও যুদ্ধ শুরুর আগেই নিশ্চিত করেছিল যে, ইরান সক্রিয়ভাবে পরমাণু বোমা তৈরির কাজ করছে না।

অর্থনৈতিক সুবিধার ক্ষেত্রেও এই চুক্তি ইরানকে বড় ধরনের ছাড় দিচ্ছে। যেখানে আগের চুক্তিতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি ছিল ইরানের পারমাণবিক আচরণের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে নতুন স্মারকে একটি নির্ধারিত সময়সূচীর ভিত্তিতে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া যুদ্ধের ফলে বিধ্বস্ত ইরানি অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল এবং ইরানের জব্দকৃত সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টিও চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় এসওএএস-এর শিক্ষক আলী আলাভি মনে করেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপের মুখে ট্রাম্প আগের চুক্তির চেয়েও অনেক বেশি ছাড় দিতে বাধ্য হয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

এই সমঝোতায় সব রণাঙ্গনে সামরিক অভিযান বন্ধের কথা বলা হলেও, সেখানে ইসরায়েলের নাম উল্লেখ করা হয়নি। ফলে লেবাননের দক্ষিণ অঞ্চলে ইসরায়েলি দখলদারিত্ব অব্যাহত থাকা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন শঙ্কা। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে প্রণোদনা দিয়ে মূলধারায় ফিরিয়ে আনা এবং পারস্পরিক আস্থার ক্ষেত্র তৈরি করাই হবে আগামী ৬০ দিনের আলোচনার মূল চ্যালেঞ্জ। এই প্রক্রিয়াই নির্ধারণ করবে, ট্রাম্পের এই উদ্যোগ কেবল স্থিতাবস্থা বজায় রাখার চেষ্টা নাকি মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

0%
0%
0%
0%