অভিবাসন নীতিতে কঠোর কানাডা: সংকটের মুখে দীর্ঘদিনের উদার ঐতিহ্য

কানাডা দীর্ঘকাল ধরে অভিবাসনের প্রশ্নে যে উদার ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে আসছিল, সাম্প্রতিক আর্থ-সামাজিক সংকটের মুখে সেই ঐকমত্য ভেঙে পড়ছে। অভিবাসীদের প্রতি দেশটির সরকার ক্রমেই কঠোর অবস্থান গ্রহণ করছে, যা মানবাধিকারকর্মী ও নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কানাডা এখন এক সংকটময় সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে অভিবাসনবিরোধী মনোভাব ও নীতিগত পরিবর্তন দেশটির বহু পুরনো মানবিক মূল্যবোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
টরন্টো ভিত্তিক এফসিজে রিফিউজি সেন্টারের সহ-নির্বাহী পরিচালক ডায়ানা গ্যালেগো জানান, একদিকে বিশ্বমঞ্চে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি উদারতার বুলি আউড়ালেও, বাস্তবে দেশের ভেতর অভিবাসন নীতি কঠোরতর করা হচ্ছে। সরকারি ভাষ্য এবং বাস্তব পদক্ষেপের মধ্যে এই বিশাল পার্থক্য সাধারণ মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি ও ভয়ের সঞ্চার করছে। তথাকথিত এই ‘দরজা বন্ধের’ প্রক্রিয়ায় অস্থায়ী ভিসা বাতিল থেকে শুরু করে আশ্রয়প্রার্থীদের অধিকার সীমিত করার মতো বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গত কয়েক বছরে কানাডায় আবাসন সংকট, আকাশচুম্বী জীবনযাত্রার ব্যয় এবং স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার দীর্ঘ অপেক্ষার মতো সমস্যাগুলো তীব্র আকার ধারণ করেছে। এর ফলে জনগণের মধ্যে অভিবাসীদের প্রতি ক্ষোভ দানা বেঁধেছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটিতে অস্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৩১ লাখ ৫০ হাজারে দাঁড়িয়েছিল, যা ছিল মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮ শতাংশ। জনমতের চাপে জাস্টিন ট্রুডোর সরকার এই সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে মরিয়া হয়ে ওঠে এবং পরবর্তীতে মার্ক কার্নির প্রশাসনও সেই ধারা অব্যাহত রাখে।
এই বছরের শুরুতে অস্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যা ১৫ শতাংশ কমে ২৬ লাখ ৭০ হাজারে নেমে এলেও, এটি সাধারণ মানুষের ক্ষোভ প্রশমনে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারেনি। বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টি অভিবাসীদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা সীমিত করা এবং জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের নিয়ম পরিবর্তনের মতো কট্টরপন্থী দাবি তুলে জনরোষকে পুঁজি করছে। বিশ্লেষকদের মতে, সরকার এসব সংকট সমাধানের পরিবর্তে অভিবাসীদের ‘বলির পাঁঠা’ বানাচ্ছে।
এই পরিস্থিতির সর্বশেষ সংযোজন হলো বিতর্কিত আইন ‘বিল সি-১২’, যা অটোয়াকে জনস্বার্থের দোহাই দিয়ে ভিসা বাতিলসহ অভিবাসন প্রক্রিয়ায় ব্যাপক ক্ষমতা প্রদান করেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের আইনজীবী জুলিয়া স্যান্ডের মতে, সরকার প্রকৃত সমস্যাগুলোর দায় এড়াতে অভিবাসীদের লক্ষ্যবস্তু করছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই বিভাজন কেবল অভিবাসীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা দীর্ঘমেয়াদে কানাডার গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বর্তমানে টরন্টোর বিভিন্ন অধিকারকর্মী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা ‘নো মোর ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ স্লোগান তুলে সরকারের এই নীতি পরিবর্তনের আহ্বান জানাচ্ছেন। তাদের মতে, অভিবাসন নিয়ে যে ভুল ধারণা বা কুসংস্কার ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, তা বন্ধ করা জরুরি। মানবাধিকারকর্মীরা মনে করছেন, সরকার যদি অবিলম্বে দায়বদ্ধতার পরিচয় না দেয়, তবে কানাডার মানবিক ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
