যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার দ্বারপ্রান্তে বৈরুতে ইসরায়েলি হামলা ও অভ্যন্তরীণ বিরোধের শঙ্কা

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনায় তেহরানের বাজারগুলোতে কিছুটা আশার সঞ্চার হয়েছে। ১০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে চলা সংঘাত ও চরম উত্তেজনার পর এই চুক্তির সম্ভাবনা ঘিরে দেশটির অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। কাতার থেকে মধ্যস্থতাকারীদের একটি দল রোববার তেহরানে পৌঁছালে আলোচনার গতি আরও বৃদ্ধি পায়। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে রোববারই এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে, তবে দেশটিতে সক্রিয় কঠোরপন্থী গোষ্ঠীগুলোর তীব্র বিরোধিতার মুখে শেষ মুহূর্তে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এই সমঝোতার প্রত্যাশায় রোববার ইরানের জাতীয় মুদ্রার মান কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। দুপুরের দিকে তেহরানের খোলা বাজারে প্রতি মার্কিন ডলার ১.৬৮ মিলিয়ন রিয়ালের নিচে লেনদেন হয়েছে। গত মাসে ডলারের বিপরীতে রিয়ালের মান ১.৯০ মিলিয়নের সর্বনিম্নে নেমে গেলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে ছুটির দিন থাকলেও ইরানে সোনার দাম ৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। প্রতি ‘ইমামি’ স্বর্ণমুদ্রা ১.৭১ বিলিয়ন রিয়াল বা প্রায় ১,০১০ ডলারে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া তেহরান স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ১ লাখ ২৩ হাজার পয়েন্ট বেড়ে ৪.৮২ মিলিয়ন পয়েন্টের নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।

অর্থনৈতিক সূচকে এই উন্নতির খবর পাওয়া গেলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে সংশয় রয়ে গেছে। তেহরানের এক বাসিন্দা জানান, মুদ্রাবাজারে এই সাময়িক স্থিতিশীলতা দীর্ঘমেয়াদী ভোগান্তি কমাতে কার্যকর হবে না। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যে হারে বেড়েছে, ডলারের দরপতন হলেও তার সুফল সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থাকবে বলে মনে করছেন তারা। এদিকে, ইরানের অভ্যন্তরে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে ক্ষমতার লড়াই এবং সমঝোতার বিরুদ্ধে কঠোরপন্থীদের অবস্থান পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। কওম শহরের মতো ধর্মীয় কেন্দ্রগুলোতে সমঝোতাবিরোধী স্লোগান ও বিক্ষোভ দেখা গেছে।

দেশটির প্রভাবশালী কট্টরপন্থী আইনপ্রণেতা মাহমুদ নাবাবিয়ান রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সমঝোতার খসড়া নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন। তার দাবি, এই চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে মাসের পর মাস ধরে চলা যুদ্ধ থেকে অর্জিত রাজনৈতিক ও সামরিক সাফল্য বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে। সমঝোতার বিরোধিতাকারীরা জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও অবস্থান নেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। তবে এমন পরিস্থিতিতে হাসান খোমেনি দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর আস্থা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে জাতীয় স্বার্থে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়।

বিজ্ঞাপন

এই সমঝোতা প্রক্রিয়ার মধ্যে আঞ্চলিক অস্থিরতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহরে ইসরায়েলি বাহিনী পুনরায় বিমান হামলা চালিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর এই সামরিক পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হলো ইরানকে উসকে দিয়ে চুক্তির প্রক্রিয়াটি ভণ্ডুল করে দেওয়া। গত বছর ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকেই পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক রয়েছে। আল জাজিরা জানিয়েছে, ইরানের প্রয়াত প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির আমলে এমন একটি সমঝোতার খুব কাছে গিয়েও মাহসা আমিনি হত্যাকাণ্ডের জেরে সৃষ্ট বিক্ষোভ ও পরবর্তী আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে তা ভেস্তে গিয়েছিল। এখনকার পরিস্থিতিতেও ইসরায়েলের এই ভূমিকা চুক্তির সফলতাকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

0%
0%
0%
0%