AdvertisementAdvertisement

ভারতে প্রজনন হার কমে ১.৯, জনমিতিক সংকটের মুখে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি

ভারতের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার প্রথমবারের মতো স্থিতিশীলতার সূচক ছাড়িয়ে নিচে নেমে গেছে, যা দেশটির ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও শ্রমবাজারের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি রেজিস্ট্রার জেনারেল ও আদমশুমারি কমিশনারের কার্যালয় থেকে প্রকাশিত নমুনা নিবন্ধন পদ্ধতির তথ্যানুযায়ী, ভারতে বর্তমানে নারীপ্রতি প্রজনন হার বা টোটাল ফার্টিলিটি রেট কমে ১.৯-এ দাঁড়িয়েছে। জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখার জন্য যে হার ২.১ প্রয়োজন, তার চেয়ে এই নিম্নমুখী প্রবণতা ভবিষ্যৎ কর্মক্ষম জনশক্তি সংকট ও বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি করেছে। অথচ ২০০০ সালের শুরুর দিকেও ভারতে এই হার ছিল ৩.৩।

জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে ভারত দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর নীতি অনুসরণ করেছে। ১৯৭০-এর দশকে পরিবার পরিকল্পনার নামে বিতর্কিত নির্বীজন কর্মসূচিসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। এমনকি ২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও ‘জনসংখ্যা বিস্ফোরণ’ নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ভারতের জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারী শিক্ষা ও জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির সহজলভ্যতা এবং সন্তান লালন-পালনের ক্রমবর্ধমান ব্যয় এই পরিবর্তনের প্রধান নিয়ামক।

Advertisement
বিজ্ঞাপন

শিশুমৃত্যুর হার কমে আসা প্রজনন হার হ্রাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ২০১৯ সালে প্রতি ১০০০ জীবিত জন্মে শিশুমৃত্যুর হার ছিল ৩০, যা ২০২৪ সালে ২৪-এ নেমে এসেছে। তবে ভারতের রাজ্যভেদে এই হারে ব্যাপক বৈষম্য রয়েছে। বিহার ও উত্তরপ্রদেশের মতো তুলনামূলক অনুন্নত রাজ্যগুলোতে প্রজনন হার যথাক্রমে ২.৯ ও ২.৬ থাকলেও, দিল্লি ও কেরালায় তা ১.২ থেকে ১.৩-এর ঘরে নেমে এসেছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও নারীর ক্ষমতায়ন যে প্রজনন হার হ্রাসে ভূমিকা রাখছে, দক্ষিণের রাজ্যগুলোই তার বড় প্রমাণ।

Advertisement
বিজ্ঞাপন

ভারতের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হলো, জনতাত্ত্বিক লভ্যাংশ বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া। ২০০৫ সাল থেকে ভারত কর্মক্ষম মানুষের প্রাচুর্যের সুবিধা ভোগ করছে, যা ২০৫৫ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার কথা। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, কর্মসংস্থানের অভাব এবং ক্রমবর্ধমান বয়স্ক জনসংখ্যার কারণে চীন বা জাপানের মতো ভারত হয়তো পূর্ণ অর্থনৈতিক সুবিধা নিতে ব্যর্থ হতে পারে। কর্মক্ষম জনবল কমে গেলে ভবিষ্যতে বয়স্কদের স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন ও সামাজিক সুরক্ষাই হবে দেশটির প্রধান চ্যালেঞ্জ।

এদিকে, ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা অপপ্রচার থাকলেও সরকারি তথ্য ভিন্ন কথা বলছে। তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯২ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে মুসলিমদের প্রজনন হার ৪.৪১ থেকে কমে ২.৩৬ হয়েছে, যেখানে হিন্দুদের হার ৩.৩ থেকে ১.৯৪-এ নেমে এসেছে। সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যেই প্রজনন হার কমে আসছে। এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার তৃতীয় বা চতুর্থ সন্তানের জন্মের জন্য যথাক্রমে ৩০ হাজার রুপি ও ৪০ হাজার রুপি দেওয়ার ঘোষণা দিলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধির চেয়ে প্রবীণদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

0%
0%
0%
0%