ইকুয়েডরে সামরিক অভিযানে ৫১ ব্যক্তির নিখোঁজের ঘটনায় বিচার ও জবাবদিহিতার দাবি পরিবারের

একসময়ের লাতিন আমেরিকার অন্যতম নিরাপদ রাষ্ট্র ইকুয়েডর এখন অপরাধ জগতের এক ভয়াবহ রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। মাদকের চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক কার্টেলগুলোর আগ্রাসনে দেশটিতে বেড়েছে রক্তপাত ও সহিংসতা। এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় প্রেসিডেন্ট দানিয়েল নোবোয়া দেশজুড়ে সামরিক অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে এই কঠোর অভিযানের আড়ালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে সরকারের বিরুদ্ধে। আল জাজিরার ‘ফল্ট লাইনস’-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সামরিক অভিযানের সময় ৫১ জন ব্যক্তি নিখোঁজ হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

নিখোঁজদের পরিবারগুলো এখন চরম অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। ইকুয়েডরের ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল লিওনার্দো আলারকোন এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, নিখোঁজের এসব ঘটনায় বর্তমানে ৩৪টি প্রাথমিক তদন্ত চলমান রয়েছে এবং ভুক্তভোগীর সংখ্যা ৫১। তিনি দাবি করেন, বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। তবে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, তদন্তের গতি অত্যন্ত ধীর এবং সরকারি অসহযোগিতার কারণে ন্যায়বিচার পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

তেমনই এক ভুক্তভোগী জোনাথান ভিলন। দেড় বছরের বেশি সময় আগে গুয়ায়াকিল শহর থেকে নিখোঁজ হওয়া ৩১ বছর বয়সী এই যুবককে শেষবার দেখা গিয়েছিল সামরিক বাহিনীর গাড়িতে তোলার সময়। সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা গেছে, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাচ্ছে। অথচ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ওই সময় ওই এলাকায় তাদের কোনো অভিযান ছিল না। জোনাথানের পরিবারের আইনজীবী ফার্নান্দো বাস্তিয়াস অভিযোগ করেন, মন্ত্রণালয় তথ্য গোপন করে তদন্ত প্রক্রিয়াকে পুরোপুরি স্থবির করে রেখেছে।

এদিকে, নিখোঁজদের স্বজনরা প্রতিনিয়ত বিচারের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন। নিখোঁজ জোনাথানের বোন রোজারিও ভিলন জানান, ভাতিজার প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে না পেরে তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। একই আর্তনাদ জোনাথানের সঙ্গী ইয়াদিরা বোরকেজের কণ্ঠে। তিনি সামরিক কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যেন তারা সত্য প্রকাশ করেন। সরকারি ভাষ্যমতে তদন্ত চললেও বাস্তবচিত্র বলছে, তথ্যের অভাবে অধিকাংশ পরিবারই তাদের প্রিয়জনের পরিণতি সম্পর্কে কিছুই জানতে পারছে না।

বিজ্ঞাপন

তবে এর মধ্যেই একটি ঘটনায় বিচারের নজির স্থাপিত হয়েছে, যা দেশটিতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। গুয়ায়াকিলের লাস মালভিনাস এলাকায় চার কিশোর নিখোঁজের পর প্রথমে সামরিক বাহিনী তাদের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজে বিমান বাহিনীর কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার প্রমাণ মেলে। তদন্তের শেষে পাঁচ সেনাসদস্য দায় স্বীকার করলেও বাকি ১১ জন সেনাসদস্যকে দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মানবাধিকার কর্মী ক্যামিলা রুইজ সেগোভিয়া এই রায়কে লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে অভিহিত করেছেন।

তা সত্ত্বেও, ৫১ জন নিখোঁজের বিশাল তালিকা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। আল জাজিরার পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট নোবোয়ার কার্যালয় ও সামরিক বাহিনীর কাছে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কোনো সাড়া দেয়নি। জোনাথান ভিলনের মতো নিখোঁজদের পরিবারগুলো এখনো বুকভরা আশা নিয়ে অপেক্ষায় আছে, সামরিক বাহিনী অন্তত একবার সত্যের মুখোমুখি হবে। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের এই নীরবতা আর অসহযোগিতা তাদের এক অন্তহীন অনিশ্চয়তার বৃত্তে বন্দি করে রেখেছে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

0%
0%
0%
0%