দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটে স্পিন বিপ্লবের রূপকার কেশভ মহারাজ

দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটের ইতিহাসকে যেন দুই ভাগে ভাগ করা যায়—কেশভ মহারাজ-পূর্ববর্তী এবং মহারাজ-পরবর্তী। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে হিউ টেফিল্ডের পর প্রোটিয়া ক্রিকেটে স্পিনারদের ওপর ভরসা করার রীতি প্রায় উঠে গিয়েছিল। পেস-সহায়ক উইকেটের দেশে স্পিন বোলিংকে সবসময়ই দ্বিতীয় সারির অস্ত্র হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু কেশভ মহারাজের আবির্ভাব সেই অচলায়তন ভেঙে দিয়েছে। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, স্পিন কেবল রান আটকানোর মাধ্যম নয়, বরং তা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার এক ধারালো অস্ত্র।
মহারাজের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে রাসেল ডোমিঙ্গো, ফাফ দু প্লেসি ও ইমরান তাহিরের মতো ব্যক্তিত্বদের সম্মিলিত অবদান। বিশেষ করে দু প্লেসির অধিনায়কত্বে এবং ডোমিঙ্গোর দূরদর্শী পরিকল্পনায় মহারাজের মতো একজন ফিঙ্গার স্পিনার দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠেন। অথচ ১২ বছর বয়সে নর্থল্যান্ডস প্রাইমারি স্কুলের নেটে কোচ অ্যান্ড্রু বেনিসনের সাথে তর্কে জড়িয়ে রাগের বশেই স্পিন বোলিং শুরু করেছিলেন তিনি। সেই জেদ থেকেই আজকের এই বিশ্বমানের স্পিনার মহারাজের জন্ম।
২০১৬ সালে পার্থের ওয়াকা গ্রাউন্ডে টেস্ট অভিষেক হওয়াটা ছিল বিস্ময়কর। কিন্তু সেই অভিষেকেই স্টিভ স্মিথ ও মিচেল স্টার্কের মতো ব্যাটারদের শিকার করে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, দক্ষিণ আফ্রিকান স্পিন বিপ্লবের নেতৃত্বে তিনিই থাকছেন। অভিষেক টেস্টে ১৮.২ ওভার বল করে ৩.০৫ ইকোনমি রেটে বোলিং করার পাশাপাশি ব্যাট হাতে ৪১ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলে তিনি প্রোটিয়াদের বড় জয়ের পথ প্রশস্ত করেছিলেন। সেই ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকা ১৭৭ রানের ব্যবধানে জয় পায়, যা ছিল মহারাজের ক্যারিয়ারের এক উজ্জ্বল সূচনা।
টেস্ট ক্রিকেটে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পর মহারাজ সীমিত ওভারের ক্রিকেটেও নিজেকে অপরিহার্য করে তোলেন। মার্ক বাউচারের অধীনে ঘরোয়া ক্রিকেটে দারুণ পারফর্ম করার পর ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি দলেও তিনি নিয়মিত সুযোগ পেতে শুরু করেন। বর্তমানে তিনি শুধু প্রোটিয়াদের প্রধান স্পিনারই নন, বরং দলের একজন অভিজ্ঞ পরামর্শদাতা হিসেবেও ভূমিকা রাখছেন। আধুনিক ক্রিকেটে স্পিন যে কেবল রক্ষনাত্মক নয়, বরং উইকেটের প্রয়োজনে আক্রমণাত্মক অস্ত্র হতে পারে, তা বারবার প্রমাণ করেছেন তিনি।
বর্তমানে ৩৬ বছর বয়সী এই স্পিনার এখন ক্যারিয়ারের গোধূলি লগ্নে দাঁড়িয়ে। তবে খেলা ছাড়ার পর স্পিন পরামর্শক বা হাই পারফরম্যান্স ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করার স্বপ্ন বুনছেন তিনি। তার লক্ষ্য, দক্ষিণ আফ্রিকান ক্রিকেটে স্পিনের জয়যাত্রা যেন কোনোভাবেই থমকে না যায়। কেশভ মহারাজ নিজে যেমন এক বিপ্লবের নাম, তেমনই তিনি আগামী প্রজন্মের স্পিনারদের জন্য রেখে যেতে চান এক শক্তিশালী ভিত্তি। তার হাত ধরেই দক্ষিণ আফ্রিকান ক্রিকেটে স্পিন এখন এক নান্দনিক শিল্পের নাম, যা ভবিষ্যতে আরও উজ্জ্বল হবে বলেই প্রত্যাশা।
