ভিএআর বিতর্ক ও দুর্ভাগ্যের দোলাচলে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিল ইরান

স্বপ্নভঙ্গ আর অবিশ্বাস্য দুর্ভাগ্য সঙ্গী করে ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের দরজা থেকে ছিটকে গেল ইরান। সিয়াটলে মিশরের বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র করে গ্রুপ ‘জি’-তে তিন ম্যাচে তিন ড্র নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে শেষ করে ‘টিম মেল্লি’। ফিফা বিশ্বকাপের পরিধি ৪৮ দলে উন্নীত হলেও, অন্য ম্যাচের ফলাফল তাদের বিদায়ের পথ নিশ্চিত করে। মাত্র এক পয়েন্টের ব্যবধানে শেষ ষোলোর দৌড় থেকে ছিটকে পড়া ইরানকে ঘিরে তৈরি হয়েছে চরম হতাশা ও বিতর্কের ঝড়।
ম্যাচের ৯৩তম মিনিটে শুজা খলিলজাদেহ যখন গোল করে ইরানকে জয়ের বন্দরে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন পুরো স্টেডিয়ামে উল্লাস ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু ভিএআর প্রযুক্তির সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণে তার পা অফসাইডের দায়ে গোলটি বাতিল হয়ে যায়। এই টুর্নামেন্টে ইরান মোট ৩টি গোল ভিএআর-এর মাধ্যমে বাতিল হওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে। এমন হতাশাজনক বিদায়ের পর কোচ আমির ঘালেনোয়েই আক্ষেপ করে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেন, মনে হচ্ছে ভাগ্য বিধাতা আমাদের সহায় ছিলেন না।
ইরানের এই বিশ্বকাপ যাত্রা ছিল নজিরবিহীন প্রতিকূলতায় ঘেরা। যুদ্ধের উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আয়োজিত এই টুর্নামেন্টে খেলতে যাওয়া ইরানি দলটির ওপর ছিল কঠোর বিধিনিষেধ। খেলোয়াড়দের মেক্সিকোর তিজুয়ানায় অবস্থান করতে হয়েছে এবং প্রতিটি ম্যাচের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ ও প্রস্থানের বাধ্যবাধকতা মানতে হয়েছে। এমনকি হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন সামরিক হামলার ছায়াও পড়েছিল তাদের প্রস্তুতির ওপর। ভিসা জটিলতায় অনেক কর্মকর্তা ও গণমাধ্যমকর্মী যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারেননি।
নকআউট পর্বে ওঠার সমীকরণ ছিল অত্যন্ত জটিল। ক্রোয়েশিয়া বনাম ঘানা, ডিআর কঙ্গো বনাম উজবেকিস্তান এবং আলজেরিয়া বনাম অস্ট্রিয়া ম্যাচের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে ছিল পুরো ইরান। আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়ার ম্যাচটি ৩-৩ গোলে ড্র হওয়ায় ইরান সরাসরি প্রতিযোগিতার বাইরে চলে যায়। আলজেরিয়ার রিয়াদ মাহরেজ শেষ সময়ে গোল করে দলকে এগিয়ে দিলেও অস্ট্রিয়ার সাশা কালাজজিচের গোল মুহূর্তেই ইরান সমর্থকদের স্বপ্ন চূর্ণ করে দেয়। ম্যাচ পাতানোর অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে অস্ট্রিয়ার কোচ রালফ রাংনিক বিষয়টিকে আলফ্রেড হিচককের সিনেমার গল্পের চেয়েও নাটকীয় বলে মন্তব্য করেছেন।
রাজনৈতিক অস্থিরতা আর অভ্যন্তরীণ আন্দোলনের রেশ এই বিশ্বকাপে ইরানের ফুটবলারদের ছায়া হয়ে লেগেছিল। দেশের সাধারণ মানুষের একাংশের কাছে এই দলকে নিয়ে ছিল মিশ্র প্রতিক্রিয়া। মোহাম্মদ খাকপৌর ও ফারহাদের মতো অনেকের মতে, ফুটবলের এই হার কেবল একটি খেলার ফল নয়, বরং এটি সমাজ ও রাজনীতির এক গভীর বিভাজনের বহিঃপ্রকাশ। মাঠের লড়াই আর মাঠের বাইরের উত্তাপ মিলে ২০২৬ সালের এই বিশ্বকাপ ইরান ফুটবল ইতিহাসের এক বেদনাদায়ক অধ্যায় হয়ে থাকবে।