বিশ্বকাপের মঞ্চে বাস্তুচ্যুতদের জয়গান যুদ্ধের বিভীষিকা জয় করে ফুটবলের আলোয় তারকারা

ফিফা বিশ্বকাপকে ঘিরে ফুটবল বিশ্বের উন্মাদনা এখন তুঙ্গে। কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের এই আসরে ৪৫টি দেশের অংশগ্রহণে ফুটবল মাঠ হয়ে উঠেছে যুদ্ধের বিভীষিকা জয় করা অদম্য যোদ্ধাদের মিলনমেলা। এই টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া অন্তত ৯ জন ফুটবলার বহন করছেন শরণার্থী জীবন বা বাস্তুচ্যুত হওয়ার এক দীর্ঘ ইতিহাস। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে প্রায় ১১ কোটি ৭০ লাখ মানুষ আজ বাস্তুচ্যুত। এই কঠিন বাস্তবতাকে আড়াল করে মাঠের পারফরম্যান্সে আশার আলো ছড়াচ্ছেন এসব ফুটবলাররা।

বিজ্ঞাপন

ভ্যাঙ্কুভারে তুরস্কের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার ২-০ গোলের শ্বাসরুদ্ধকর জয়ে গোল করে ইতিহাস গড়েছেন নেস্টোরি ইরানকুনদা। মাত্র ২০ বছর বয়সী এই ফুটবলার অস্ট্রেলিয়ার হয়ে বিশ্বকাপে গোল করা সবচেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড় হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। গোল করে তিনি কিংবদন্তি টিম কাহিলের আদলে কর্নার ফ্ল্যাগে ঘুষি মেরে উদযাপন করেন। তবে এই আনন্দের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক করুণ অতীত। তার জন্ম তানজানিয়ার কিগোমা শরণার্থী শিবিরে, যখন তার পরিবার বুরুন্ডির গৃহযুদ্ধ থেকে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়েছিল।

ইরানকুনদার মতো আরও অনেকের গল্পের শুরুটা হয়েছে শরণার্থী শিবির থেকে। কানাডার অধিনায়ক আলফোনসো ডেভিস ঘানার বুদুবুরাম শরণার্থী শিবিরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। লাইবেরিয়ার গৃহযুদ্ধ থেকে পালিয়ে তার পরিবার আশ্রয় নিয়েছিল সেখানে। পরবর্তীকালে কানাডায় থিতু হওয়া ডেভিস আজ বিশ্ব ফুটবলের বড় তারকা এবং ইউএনএইচসিআর-এর শুভেচ্ছাদূত। অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়ার স্ট্রাইকার মোহামেদ তোরে গিনির একটি শরণার্থী শিবিরে বেড়ে উঠেছেন। লাইবেরিয়ার সহিংসতা থেকে বাঁচতে তার পরিবার ১৪ বছর অপেক্ষার প্রহর গুনেছে পুনর্বাসনের আশায়। অস্ট্রেলিয়ার জার্সি গায়ে তুলে তিনি আজ গর্বিত।

সাকার মেবিলও একইভাবে কেনিয়ার কাকুমা শরণার্থী শিবিরে জন্ম নিয়েছেন। দক্ষিণ সুদানের গৃহযুদ্ধ থেকে বেঁচে ফেরা মেবিল ২০২২ সালের বিশ্বকাপে পেনাল্টি থেকে গোল করে অস্ট্রেলিয়াকে মূল পর্বে তোলার নায়ক ছিলেন। এছাড়া বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার হয়ে খেলা আরমিন দেমিরোভিচ এবং গোলরক্ষক আসমির বেগোভিচও তাদের শৈশবে যুদ্ধের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেছেন। জার্মান ডিফেন্ডার আন্তোনিও রুডিগারের মা সিয়েরা লিওনের গৃহযুদ্ধ থেকে পালিয়ে জার্মানির নোইকোলনে আশ্রয় নিয়েছিলেন, যা রুডিগারের ক্যারিয়ারে এক অনন্য বৃত্ত সম্পন্ন করেছে।

বিজ্ঞাপন

তালিকায় থাকা ইরাকের আলী আল-হামাদি শৈশবেই পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমিয়েছিলেন ইরাকি নিপীড়নের হাত থেকে বাঁচতে। চার দশকের অপেক্ষার পর ইরাকের বিশ্বকাপ যাত্রায় তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। এছাড়া ফ্রান্সের এডুয়ার্ডো কামাভিঙ্গা অ্যাঙ্গোলার শরণার্থী শিবিরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন কঙ্গোর যুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসার পর। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের বার্নার্ড কামুঙ্গো শেষ পর্যন্ত মূল দলে জায়গা পাননি এবং নাইজেরিয়ার ভিক্টর মোজেস দলগত সীমাবদ্ধতায় এবারের আসরে নেই, তবে তাদের জীবনের লড়াই ফুটবলপ্রেমীদের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাই কমিশনার বারহাম সালেহ জানিয়েছেন, এই বিশ্বকাপ বিশ্বজুড়ে মানুষের মনে এক নতুন আশার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার আদর্শ মঞ্চ।

0%
0%
0%
0%