অনিশ্চয়তার লড়াই জয়: ধোনির মন্ত্রে নিজেকে নতুন করে চেনা এক ফিনিশার

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে একজন ফিনিশারের জীবন অনেকটা লটারির মতো। কোনোদিন হয়তো তাকে ক্রিজে যেতে হয় ইনিংসের মাত্র ৫ বল বাকি থাকতে, আবার কোনোদিন বিপর্যয়ের মুখে হাল ধরতে হয় পাওয়ার-প্লের পরপরই। কখনও আবার প্যাড পরে অপেক্ষায় থাকতেই শেষ হয়ে যায় পুরো ম্যাচ। অনিশ্চয়তার এই গোলকধাঁধায় নিজের মানসিকতা আর প্রস্তুতির নতুন সংজ্ঞা লিখছেন তরুণ ব্যাটার সূর্যাংশ শেজ।
অপেক্ষা এবং চাপের দোলাচল
সৈয়দ মুশতাক আলি ট্রফিতে মুম্বাইয়ের হয়ে চলতি মরসুমে ৯টি ম্যাচের মধ্যে ৫টিতেই তাকে ব্যাট হাতে নামার সুযোগ পাননি শেজ। যখন সুযোগ এসেছে, তখনও ছিল চরম অনিশ্চয়তা। ১০ম থেকে ১৫তম ওভারের মধ্যে যখনই তিনি ক্রিজে এসেছেন, বড় ইনিংস খেলার সুযোগ থাকলেও কোথাও যেন একটা তাল কেটে যাচ্ছিল। পাওয়ার-হিটিং যার সবচেয়ে বড় শক্তি, সেই শক্তিই যেন চাপের মুখে তার দুর্বলতা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল।
শেজ নিজেই স্বীকার করেছেন সেই চাপের কথা, “একটি খেলা শেষ করার সাথে যে পরিমাণ চাপ আর প্রত্যাশা থাকে, তা কেবল একজন ক্রিকেটারই অনুভব করতে পারেন। সংকটের সময় যখন আপনি নিজের কাছ থেকে অতিরিক্ত আশা করতে শুরু করেন, তখন মন আসল কাজ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়।”
ধোনির সেই অমূল্য পরামর্শ
গত আইপিএল মরসুমে কলকাতা নাইট রাইডার্সের বিপক্ষে পাঞ্জাব কিংসের হয়ে ইমপ্যাক্ট সাবস্টিটিউট হিসেবে নেমেছিলেন শেজ। মাত্র ৪ রান করে আউট হওয়ার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। সেই সময় তার ত্রাতা হয়ে আসেন ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফিনিশার এমএস ধোনি।
ধোনি তাকে বলেছিলেন, “ফিনিশার হতে হলে আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। সাফল্য আপনাকে যেমন খুব বেশি আনন্দিত না করে, ব্যর্থতা যেন তেমনি খুব বেশি বিমর্ষ না করে।” ধোনির এই শান্ত থাকার মন্ত্রটিই শেজ তার জীবনের মূল লক্ষ্য বানিয়ে নিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, মাঠের বিশৃঙ্খলার মাঝেও শান্ত থাকার শক্তি আসে কেবল সঠিক প্রস্তুতি থেকে।
প্রস্তুতিতে নতুন মোড়
যতীন পরাঞ্জপের অধীনে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শেজ তার ব্যাটিংয়ে বৈচিত্র্য এনেছেন। মুম্বাই অনূর্ধ্ব-২৩ দলের হয়ে লাল বলের ক্রিকেটে ইনিংস গড়া এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী বিস্ফোরক ব্যাটিং—উভয় ক্ষেত্রেই নিজেকে ঝালিয়ে নিয়েছেন তিনি। তার বর্তমান দর্শনের মূল কথা হলো ‘স্কোরবোর্ড পড়া’। কোচের পরামর্শ মেনে তিনি এখন পরিস্থিতির চাহিদা অনুযায়ী নিজের সহজাত প্রবৃত্তি ব্যবহার করছেন।
সুযোগের সদ্ব্যবহার: আইপিএলের মঞ্চে প্রত্যাবর্তন
চলতি আইপিএলের প্রথম দিকে সাইডবেঞ্চে বসে থাকলেও গত রবিবার পাঞ্জাব কিংসের হয়ে সুযোগটি লুফে নেন তিনি। পাওয়ার-প্লে শেষ হওয়ার পরপরই যখন দলের স্কোর ৫ উইকেটে ৪৭ রান, তখন ক্রিজে আসেন শেজ। চাপের মুখে ভেঙে না পড়ে তিনি দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি দ্রুত গতিতে রান তোলেন। মানব সুথারের এক ওভারে ২৬ রানসহ তার দ্রুতগতির অর্ধশতক পাঞ্জাবকে ১৬৩ রানের একটি লড়াই করার মতো পুঁজিতে পৌঁছে দেয়।
ম্যাচটি পাঞ্জাব না জিতলেও শেজের এই ইনিংসটি ছিল এক নতুন সূচনার ইঙ্গিত। আইপিএলের আগামী দিনগুলোতে তার ভূমিকা কী হবে তা নিশ্চিত নয়—হয়তো দ্রুতগতির ফিফটি, কিংবা শেষ বলে ছক্কা। তবে সেই দিনটির জন্য ধীরস্থিরভাবে অপেক্ষা করতেই এখন সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন এই তরুণ হার্ড-হিটার। নিজের সামর্থ্যের ওপর বিশ্বাস আর মনের প্রশান্তি নিয়ে শেজের এই যাত্রা অব্যাহত রয়েছে।
