স্মৃতির আয়নায় রোমান্টিক স্যাড ব্যালডের জাদুকর শিল্পী হাসান আবিদুর রেজা জুয়েল

নব্বইয়ের দশকের বাংলাদেশের সংগীতাকাশে যখন নতুন সুর আর তারুণ্যের উন্মাদনায় মেতে উঠেছিল চারপাশ, তখনই এক অনন্য কণ্ঠস্বরের জাদুকর হয়ে উদয় হয়েছিলেন হাসান আবিদুর রেজা জুয়েল। তাঁর কণ্ঠে ছিল বিষণ্নতার কোমল পরশ, বিরহের সুগভীর আবেদন আর নিঃসঙ্গতার এক মায়াবী সুর। কেবল সংগীতের খাতিরে নয়, বরং হৃদয়ের স্পন্দন থেকেই যিনি গান গেয়ে গেছেন আমৃত্যু, সেই প্রিয় শিল্পীর আজ দ্বিতীয় প্রয়াণ দিবস। এই দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়ে স্মৃতির ক্যানভাসে ফিরে এসেছেন সেই মানুষটি, যাঁর গানে মিশে থাকত ভালোবাসার দীর্ঘশ্বাস।
১৯৬৮ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া জুয়েলের সংগীতের হাতেখড়ি শৈশবেই। ব্যাংকার বাবার বদলির চাকরির সুবাদে দেশের নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়ানো জুয়েলের সংগীতপ্রীতি ছিল সহজাত। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় প্রথমবার মঞ্চে গান গাওয়ার মুহূর্তেই তিনি বুঝেছিলেন, সুরের জগতেই তাঁর ঠিকানা। নব্বইয়ের দশকে ঢাকায় এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি-কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে যুক্ত হয়েই মূলত নিজের শিল্পীসত্তাকে বিকশিত করার পথ খুঁজে পান তিনি।
এই পথচলার সবচেয়ে বর্ণিল অধ্যায়টি শুরু হয় কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর হাত ধরে। ১৯৯৩ সালে আইয়ুব বাচ্চুর সংগীত পরিচালনায় মুক্তি পায় জুয়েলের প্রথম একক অ্যালবাম ‘কুয়াশা প্রহর’। জুয়েলের কণ্ঠের মাধুর্য আর গায়কীর ধরনটি আইয়ুব বাচ্চুই নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। সেই পরামর্শ মেনেই তিনি নিজেকে ‘রোমান্টিক-স্যাড’ ঘরানার গানের অন্যতম আইকন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। জুয়েলের ভাষায়, সেই শুরু, এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি।
১৯৯৪ সালে প্রকাশিত ‘এক বিকেলে’ অ্যালবামটি তাঁকে এনে দেয় আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা। শ্রোতামহলে তিনি পরিচিতি পান ‘এক বিকেলের জুয়েল’ হিসেবে। এরপর ‘আমার আছে অন্ধকার’, ‘একটা মানুষ’, ‘দেখা হবে না’ কিংবা ‘বেদনা শুধুই বেদনা’-র মতো একের পর এক শ্রোতাপ্রিয় অ্যালবাম উপহার দিয়েছেন তিনি। তবে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থেকেও তিনি কখনোই সংগীতকে জীবিকার প্রধান উৎস করেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, গান যদি রুটিরুজির মাধ্যম হয়ে যায়, তবে শিল্পীর স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হয়। তাই টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাতা ও ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের মতো পেশায় নিজেকে যুক্ত রেখে গানকে সবসময় নিজের হৃদয়ের একান্ত সম্পদ হিসেবে আগলে রেখেছিলেন।
জীবনের শেষ ১৩টি বছর ছিল মরণব্যাধি ক্যানসারের সঙ্গে এক দীর্ঘ অসম লড়াই। লিভার ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার পর সেই কষ্ট ছড়িয়ে পড়েছিল ফুসফুস ও হাড়েও। শারীরিক জীর্ণতা তাঁকে কাবু করলেও সংগীতের প্রতি তাঁর অনুরাগ ছিল অটুট। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের ৩০ জুলাই ৫৬ বছর বয়সে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। আজ তিনি নেই, কিন্তু রেখে গেছেন অসংখ্য সুরের মূর্ছনা, যা আজও ভক্তদের হৃদয়ে এক অদ্ভুত শূন্যতা আর ভালোবাসার সংমিশ্রণে ধ্বনিত হয়।
