চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড পৌরসভায় জায়গা ও অর্থসংক্রান্ত জটিলতায় প্রায় ২০ কোটি টাকার পানি শোধনাগার প্রকল্প আলোর মুখ না দেখায় আট বছর ধরে স্থায়ী কোনো নিরাপদ পানি সরবরাহব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ২৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই পৌরসভার ৫০ হাজার ১৩১ জন বাসিন্দার জন্য নেই কোনো কার্যকর কেন্দ্রীয় নিরাপদ পানি সরবরাহব্যবস্থা। ফলে বাধ্য হয়ে অনেক এলাকার বাসিন্দাদের অগভীর নলকূপের পানির ওপর ভরসা করতে হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলছে।
সরকারি নথিপত্র অনুযায়ী, সীতাকুণ্ড পৌরসভার অগভীর নলকূপের পানিতে আর্সেনিক ও আয়রনের উপস্থিতি রয়েছে। অন্যদিকে, ভূগর্ভে শক্ত শিলাস্তর থাকায় প্রচলিত পদ্ধতিতে গভীর নলকূপ স্থাপনেও বড় ধরনের কারিগরি জটিলতা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এমন প্রেক্ষাপটে পৌরবাসীর দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ লাঘবে নিরাপদ পানির উৎস শনাক্ত করতে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে জরিপ চালানোর পাশাপাশি নতুন পানি সরবরাহ প্রকল্পের উদ্যোগ নিয়েছে পৌর প্রশাসন।
পৌরসভার নিরাপদ পানি সরবরাহের বর্তমান চিত্র তুলে ধরে গত ৯ জুন স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের কাছে একটি স্মারক পাঠান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক মো. ফখরুল ইসলাম। পাঠানো স্মারকে উল্লেখ করা হয়, পৌর এলাকায় কার্যকর নিরাপদ পানি সরবরাহব্যবস্থা না থাকায় এবং ভূগর্ভে শক্ত শিলাস্তর থাকায় প্রচলিত উপায়ে গভীর নলকূপ স্থাপন অত্যন্ত কঠিন। পাশাপাশি অগভীর নলকূপের পানিতে আর্সেনিক ও আয়রনের উপস্থিতি থাকায় জনস্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মুখে রয়েছে।
এই সংকট নিরসনে নতুন কারিগরি ব্যবস্থার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে স্মারকে। শক্ত শিলাস্তর ভেদ করে গভীর উৎপাদন নলকূপ স্থাপনের জন্য ‘হাইড্রোলিক রিগ’ প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি সাবমার্সিবল পাম্প, পানি শোধনাগার, সংরক্ষণ ট্যাংক ও পাইপলাইন বসানোর কথা বলা হয়েছে। প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভূগর্ভ থেকে পানি তোলার পর তা শোধন করে সংরক্ষণ করা হবে এবং পরবর্তীতে পাইপলাইনের মাধ্যমে তা পৌরবাসীর ঘরে ঘরে সরবরাহ করা হবে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সীতাকুণ্ডের সহকারী প্রকৌশলী প্রনবেশ মহাজন জানান, সাগর ও পাহাড়ের মধ্যবর্তী ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন এলাকায় ভূগর্ভে শক্ত শিলাস্তর বিদ্যমান। বর্তমানে শিলাস্তরের নিচে পানির স্তর ও এর প্রকৃতি নির্ধারণে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে জরিপ কাজ চলছে। জরিপ সম্পন্ন হলে নিরাপদ পানির উৎস সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে এবং আর্সেনিকমুক্ত সুপেয় পানি সরবরাহে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপনের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
উল্লেখ্য, সীতাকুণ্ডে পানি শোধনাগার স্থাপনের উদ্যোগ এটাই প্রথম নয়। পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী নূরনবী জানান, ২০১৮ সালে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পানি শোধনাগার নির্মাণের জন্য প্রায় ২০ কোটি টাকার বরাদ্দ পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় জমি বা জায়গা নিশ্চিত করা সম্ভব না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত সেই উদ্যোগ ভেস্তে যায় এবং বরাদ্দের অর্থ ফেরত চলে যায়। চট্টগ্রাম বিভাগের অন্যান্য পৌর এলাকায় পানি শোধনাগারের মাধ্যমে আর্সেনিকমুক্ত পানি সরবরাহ করা হলেও উপযুক্ত জায়গার অভাবে সীতাকুণ্ডবাসী তখন এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন।
এদিকে এবারের নতুন প্রস্তাবটিতে কেবল পানি সরবরাহ নয়, এর পাশাপাশি সীতাকুণ্ডে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পৌর এলাকায় কঠিন ও তরল বর্জ্য শোধনের জন্য কার্যকর কোনো শোধনাগার না থাকায় একই উদ্যোগের আওতায় একটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও শোধনাগার স্থাপনের জন্যও সরকারের কাছে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।
পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, সীতাকুণ্ড একটি প্রথম শ্রেণির পৌরসভা হওয়া সত্ত্বেও এখানকার ৫০ হাজারের অধিক মানুষ নিরাপদ পানির চরম সংকটে দিন কাটাচ্ছেন। এই জনদুর্ভোগ ও সংকট চিরতরে নিরসনে প্রয়োজনীয় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে।
বর্তমানে এই নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে নিরাপদ পানির উৎস শনাক্তকরণ, উপযুক্ত জায়গা নির্বাচন, অর্থায়ন নিশ্চিতকরণ এবং কারিগরি যাচাই-বাছাইয়ের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এখন বিশেষজ্ঞ জরিপের ইতিবাচক ফলাফল, প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন, যথাযথ অর্থায়ন এবং দ্রুত বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে পৌরবাসীর দীর্ঘ প্রতীক্ষিত স্থায়ী নিরাপদ পানি সরবরাহব্যবস্থা গড়ে ওঠার বিষয়টি।