জন্মের পর মাত্র তিন সপ্তাহ কোয়ারেন্টিনে কাটানোর কথা থাকলেও গাজীপুর সাফারি পার্কের একটি ছোট্ট অন্ধকার ঘরে দীর্ঘ ৯ বছর ধরে বন্দি জীবন কাটাচ্ছে দুটি লেপার্ড। রবিবার (৪ অক্টোবর) দুপুরে পার্ক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অবশেষে এই বন্যপ্রাণী দুটির অবর্ণনীয় বন্দিদশার অবসান ঘটতে যাচ্ছে এবং তাদের জন্য প্রায় ৬৭ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি আধুনিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশসমৃদ্ধ আলাদা বেষ্টনী নির্মাণ করা হচ্ছে।
পার্ক সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের ১৩ নভেম্বর যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়া এলাকায় একটি গাড়ি তল্লাশি করে দুটি লেপার্ড ও দুটি সিংহশাবক উদ্ধার করেছিল পুলিশ। বন্যপ্রাণী পাচারের অভিযোগে সে সময় দুজনকে আটক করা হয় এবং পরবর্তীতে এই চারটি শাবককেই গাজীপুর সাফারি পার্কে হস্তান্তর করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী কোয়ারেন্টিন শেডে তিন সপ্তাহ রাখার কথা থাকলেও সিংহশাবক দুটিকে পরবর্তী সময়ে উন্মুক্ত পরিবেশে স্থানান্তরিত করা হলেও লেপার্ড দুটি চিরতরে বন্দি থেকে যায় একই কোয়ারেন্টিন ঘরে। উদ্ধারের সময় লেপার্ড শাবক দুটির বয়স ছিল মাত্র দেড় মাস, যা এখন বেড়ে প্রায় ৯ বছরে পৌঁছেছে।
স্বাভাবিক নিয়মে লেপার্ডের জন্মগত স্বভাব হলো বুনো পরিবেশে অবাধে শিকার ধরা ও গাছে চড়ে বেড়ানো। কিন্তু জন্মের পর থেকেই এই দুটি লেপার্ডের শৈশব ও তারুণ্য কেটেছে কংক্রিটের চার দেয়ালের মাঝে। ছোট সেই ঘরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস ও চলাচলের সুযোগ না থাকায় দর্শনার্থীরাও এতদিন তাদের এক ঝলক দেখতে পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিলেন। দীর্ঘ এক দশক ধরে খাঁচাবন্দি এই প্রাণীগুলোর এমন মানবেতর জীবনযাপন বন্যপ্রাণীপ্রেমী ও সচেতন মহলে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
রোববার (৪ অক্টোবর) দুপুরে গাজীপুর সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারেক রহমান জানান, ২০২৪ সালের অত্যাবশ্যকীয় ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের আওতায় লেপার্ড দুটির জন্য একটি পৃথক বেষ্টনী নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের জন্য ৬৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রায় ১৫০ বর্গমিটার আয়তনের এই বেষ্টনীতে বন্যপ্রাণীদের স্বাভাবিক চলাচলের উপযোগিতা নিশ্চিত করতে ক্লাইবিংয়ের জন্য প্রাকৃতিক অথবা কৃত্রিম গাছপালা, সুপেয় পানির ব্যবস্থা এবং আধুনিক নাইট শেল্টার যুক্ত করা হবে। বর্তমানে পার্কের ঠিক কোন জায়গায় এই বেষ্টনীটি স্থাপন করা হবে, তার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলছে। জায়গা চূড়ান্ত হওয়ার পরই এটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
পরিবেশবাদী ও সচেতন নাগরিকদের মতে, খাঁচায় বন্দি রেখে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক আচরণ ও প্রবৃত্তি বিনষ্ট করা একধরনের নিষ্ঠুরতা। দীর্ঘ ৯ বছর পর হলেও এই লেপার্ড দুটি প্রাকৃতিক উপাদানে সমৃদ্ধ নতুন বেষ্টনীতে মুক্তভাবে চলাচলের সুযোগ পাবে—এমন খবরে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন তারা। তবে বন্যপ্রাণী রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও বেশি দায়িত্বশীল হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে যেন কোনো বন্যপ্রাণীকে এ ধরনের দীর্ঘমেডিক বা অনির্দিষ্টকালের বন্দিদশায় কাটাতে না হয়, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় প্রকৃতিপ্রেমীরা।