জ্বালানি ও অর্থসংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত দেশজুড়ে তীব্র লোডশেডিংয়ের কবলে জনজীবন

বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর্যাপ্ত সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি সংকট ও তীব্র অর্থপ্রবাহের অভাবে জাতীয় গ্রিডে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। গ্যাস সরবরাহ হ্রাস, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বিপর্যয় এবং ভারতের আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ আমদানি কমে যাওয়ায় সারা দেশে লোডশেডিংয়ের মাত্রা চরম আকার ধারণ করেছে। এর ফলে জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের মানুষ সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছেন। সরকারের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চললেও জ্বালানি আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং পিডিবির বিশাল বকেয়া বোঝা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার মধ্যরাতে দেশে রেকর্ড ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। ওই সময় বিদ্যুতের মোট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ সক্ষমতা ছিল মাত্র ১২ হাজার ৫০৫ মেগাওয়াট, যা চাহিদার প্রায় ২৩ শতাংশ ঘাটতি নির্দেশ করে। এদিকে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় গড়ে ২ হাজার ৭২২ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে, যার মধ্যে ঢাকা অঞ্চলেই ঘাটতির পরিমাণ ৫৪৭ মেগাওয়াট। আগস্টের শুরু থেকেই বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করছেন যে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে সংকট আরও ভয়াবহ হতে পারে।
বিদ্যুৎ খাতের এই নাজুক পরিস্থিতির মূলে রয়েছে জ্বালানির অভাব এবং পিডিবির কাছে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় ৪৮ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকার বকেয়া পাওনা। গত ২১ জুলাই মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর থেকে গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ওপর। বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে কয়লার সরবরাহ সংকট এবং পায়রাসহ রামপাল ও বড়পুকুরিয়া কেন্দ্রের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে মোট উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একই সময়ে প্রতিকূল আবহাওয়া ও কয়লা সংকটের অজুহাতে ভারতের ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত আদানি পাওয়ার থেকেও বিদ্যুৎ সরবরাহ ৮০০ থেকে ১ হাজার মেগাওয়াটে নেমে এসেছে।
তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো দিয়ে সাময়িক ঘাটতি মেটানোর সুযোগ থাকলেও উচ্চ উৎপাদন খরচের কারণে সরকার বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ছে। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া বিল পরিশোধ করতে না পারায় অনেক কেন্দ্র জ্বালানি কিনতে হিমশিম খাচ্ছে, ফলে বাধ্য হয়ে তারা উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে। অথচ দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট, যা চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি। বর্তমান পরিস্থিতির টেকসই উত্তরণে তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন সরকারের পক্ষ থেকে জ্বালানি আমদানির পথ সুগম করা এবং বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক অচলাবস্থা নিরসনে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
