AdvertisementAdvertisement

অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণে ১৯৯৪ সালের নীতিতে ফিরল সরকার

দেশে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা এবং মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সম্প্রতি মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রণীত ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ২০২৬’ এবং ‘ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি-২০২৬’ বাতিল করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশে বর্তমানে ১৯৯৪ সালের নীতি অনুযায়ী নির্ধারিত ১১৭টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা এবং সরকারি মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা পুনরায় কার্যকর হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ‘ওষুধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩’ অনুযায়ী কোনো তালিকা বা মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি চূড়ান্ত করার আগে জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের পরামর্শ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু নতুন তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে সেই আইনি বিধান অনুসরণ করা হয়নি, যার ফলে সেটি বাতিল করতে হয়েছে। যদিও ১৯৯৪ সালের তালিকা আপাতত বহাল রাখা হয়েছে, তবে সরকার জানিয়েছে যে জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে খুব দ্রুতই এই তালিকা হালনাগাদ করা হবে।

Advertisement
বিজ্ঞাপন

মূলত ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ১১৭টি থেকে বাড়িয়ে ২৯৭টিতে উন্নীত করেছিল। তবে তালিকা বড় করার পরপরই ওষুধ ব্যবসায়ীদের একটি অংশ এর বিরোধিতা করে আসছিল। এর মধ্যেই নতুন তালিকার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়, যা বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে। সরকারের দাবি, জনসাধারণের ওপর বাড়তি চাপ যেন না পড়ে এবং বাজারে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ বজায় থাকে, সেটিই হবে নতুন তালিকা ও মূল্য নির্ধারণের প্রধান লক্ষ্য।

সরকারি সিদ্ধান্তের আইনি ব্যাখ্যা যাই হোক না কেন, মাঠপর্যায়ে ওষুধের আকাশচুম্বী দাম নিয়ে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। ফার্মেসিগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইকোস্প্রিন, নাপা, লোসারটান, প্যারাসিটামল, অ্যাজিথ্রোমাইসিন ও এসোমিপ্রাজলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় ওষুধের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, কোম্পানি পর্যায় থেকেই বর্ধিত মূল্যে ওষুধ কিনতে হচ্ছে, যার দায়ভার সাধারণ ক্রেতাদের কাঁধেই পড়ছে। উদাহরণস্বরূপ, আগে যে নাপা সিরাপ ১৮ টাকায় কেনা যেত, এখন তা ৩১ টাকায় কিনতে হচ্ছে এবং ৩৫ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে।

Advertisement
বিজ্ঞাপন

ওষুধের বাজারের এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের সাবেক ডিন অধ্যাপক ড. আ ব ম ফারুক মনে করেন, ওষুধশিল্পে কার্যকর নজরদারি এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে না। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরীও একই সুর মিলিয়ে বলেন, ডেঙ্গুর মতো রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ফ্লুইড ও প্রয়োজনীয় ওষুধের দাম সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো দিশেহারা হয়ে পড়েছে।

এদিকে সরকারের এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন ওষুধ শিল্প সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ। বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির সাবেক মহাসচিব জাকির হোসেনের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে আইনি জটিলতা নিরসন হবে এবং ওষুধশিল্পে যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল, তা কেটে গিয়ে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরবে। তবে বিশেষজ্ঞ মহলের সতর্কবার্তা, কেবলমাত্র তালিকা সংশোধন করলেই হবে না, ওষুধের উৎপাদন থেকে শুরু করে খুচরা বিক্রয় পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কঠোর ও শক্তিশালী তদারকি নিশ্চিত করা গেলেই কেবল সাধারণ মানুষ এই পরিবর্তনের সুফল পাবে। তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন সরকারের নতুন পদক্ষেপ ওষুধ বাজারে কতটা স্থিতিশীলতা আনতে পারে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

0%
0%
0%
0%