জীবিকার সন্ধানে দূর জেলায় কুঁচিয়া শিকারি সম্প্রদায়ের জীবনসংগ্রাম

ভোরের আলো ফোটার আগেই মেঘাচ্ছন্ন আকাশের নিচে টিপটিপ বৃষ্টি উপেক্ষা করে হাঁটু সমান পানিতে নেমে পড়েন নিতাই চন্দ্র সরকার। কাঁধে বাঁশের তৈরি বিশেষ ফাঁদ ‘চাঁই’ আর হাতে এক মুঠো কেঁচো নিয়ে জলাভূমির গভীরে ছুটে চলাই তার নিত্যদিনের রুটিন। সিলেটের হবিগঞ্জ থেকে কাজের সন্ধানে লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলায় আসা এই মানুষটি এখন আট সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। কুঁচিয়া শিকারের মতো ব্যতিক্রমী পেশায় জড়িয়ে তিনি কোনোমতে টিকিয়ে রেখেছেন সংসারের চাকা।
রামগঞ্জের বালুয়া চৌমুহনী, ভোলাকোট, ভাটরা, ভাদুর, লামচর, দরবেশপুর ও চণ্ডীপুরসহ বিভিন্ন এলাকার খাল-বিল ও জলাভূমিতে এখন সিলেট অঞ্চলের অন্তত ২০ থেকে ২৫ জন মানুষ কুঁচিয়া সংগ্রহ করছেন। কৃষিকাজে লোকসান ও তীব্র দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত হয়ে তারা সুদূর নিজ জেলা ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছেন এই উপকূলীয় জনপদে। স্থানীয়ভাবে ‘মেটোসাপ’ নামে পরিচিত কেঁচো ব্যবহার করে তারা অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে এই পেশায় টিকে আছেন।
কুঁচিয়া শিকারিদের দেওয়া তথ্যমতে, সারা বছর কুঁচিয়ার পর্যাপ্ত জোগান না থাকলেও বর্ষাকালে কিছুটা ভালো আয় হয়। সংগৃহীত প্রতিটি কুঁচিয়া জীবিত অবস্থায় সংরক্ষণ করে ঢাকায় পাঠানো হয়, যা বর্তমানে প্রতি কেজি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়। বছরের অধিকাংশ সময় অভাব-অনটনে কাটলেও বর্ষা মৌসুমে মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আয়ের আশায় তারা কঠোর পরিশ্রম করে যান। তবে শীতকালে জলাভূমিতে কুঁচিয়া কমে যাওয়ায় তাদের জীবন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।
রামগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাব্বির আহমেদ সিফাত জানান, কুঁচিয়া পরিবেশের জন্য অত্যন্ত উপকারী একটি প্রাণী। ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে মাটির উর্বরতা রক্ষা ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে এর ভূমিকা অনস্বীকার্য, তাই এর প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণ করা জরুরি। এদিকে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবুল কাশেম জানান, কুঁচিয়া একটি মূল্যবান প্রাণিজ সম্পদ হিসেবে বিদেশেও সমাদৃত। কেউ বাণিজ্যিকভাবে কুঁচিয়া চাষে আগ্রহী হলে মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
জীবিকার তাগিদে বাস্তুভিটা ছেড়ে দূর জেলায় এসে এভাবেই নীরব লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন প্রান্তিক শিকারিরা। অনিশ্চয়তা ও সীমিত আয়ের বেড়াজালে বন্দী থেকেও তারা খাল-বিল ও জলাভূমিকে সম্বল করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেন। কঠোর জীবনসংগ্রামের এই চিত্র একদিকে যেমন জীবিকার বিচিত্র দিক উন্মোচন করে, তেমনি দারিদ্র্যের কষাঘাতে পিষ্ট মানুষের টিকে থাকার অদম্য ইচ্ছার কথাও জানান দেয়।
