নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাবে বঙ্গোপসাগরে মৃত্যুঝুঁকিতে কলাপাড়ার হাজারো জেলে

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপকূলের হাজার হাজার জেলে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর আশায় প্রতিনিয়ত চরম মৃত্যুঝুঁকি মাথায় নিয়ে বঙ্গোপসাগরের উত্তাল জলরাশিতে মাছ শিকারে পাড়ি জমান। কিন্তু অধিকাংশ মাছ ধরার ট্রলারে নেই পর্যাপ্ত লাইফজ্যাকেট, লাইফবয়া, জরুরি উদ্ধার সরঞ্জাম কিংবা আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা। বৈধ লাইসেন্সবিহীন অনেক ট্রলার নিয়মবহির্ভূতভাবে গভীর সমুদ্রে মাছ শিকার করায় বৈরী আবহাওয়া বা দুর্ঘটনাকবলিত হলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে প্রাণহানি ও নিখোঁজের ঘটনা।
জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পটুয়াখালী জেলায় নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে প্রায় পৌনে দুই লাখ জেলে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করেন, যার মধ্যে সরকারিভাবে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ৮০ হাজার। নিরাপত্তা সরঞ্জামের তীব্র সংকট, আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তির অভাব এবং সময়মতো আবহাওয়ার পূর্বাভাস না পাওয়ার ফলে উপকূলের এই বিশাল জনগোষ্ঠী সবসময় ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে ট্রলার মালিকরা অধিক লাভের আশায় নির্ধারিত সীমার বাইরে মাছ ধরতে পাঠালেও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চরম উদাসীনতার পরিচয় দেন।
চলতি বছরের জুলাই মাসে বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে বঙ্গোপসাগরে অন্তত ১০টি মাছ ধরার ট্রলার ডুবে যায় এবং ৫০ জনেরও বেশি জেলে নিখোঁজ হন। এর মধ্যে গত ৭ ও ১৫ জুলাই কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে দুই জেলের মরদেহ ভেসে আসে। স্থানীয় জেলেরা জানিয়েছেন, গভীর সমুদ্রে বিপদে পড়লে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার কারণে দ্রুত উদ্ধার সহায়তা পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। বিকল্প কোনো আয়ের উৎস না থাকায় জীবন হাতে নিয়েই তাদের সমুদ্রে নামতে হয়।
ট্রলার মালিকদের মতে, প্রতিটি ট্রলারে লাইফজ্যাকেট, লাইফবয়া, ইমার্জেন্সি পজিশন ইন্ডিকেটিং রেডিও বিকন ও প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জামসহ আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা সংযোজন করতে প্রচুর অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন হয়। সরকারিভাবে কোনো ধরনের ভর্তুকি বা আর্থিক সহায়তা না থাকায় অনেক মালিকই নিরাপত্তা সরঞ্জাম নিশ্চিত করতে অপারগতা প্রকাশ করছেন। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিকস বিভাগের চেয়ারম্যান ড. রাজিব সরকারের মতে, স্যাটেলাইটভিত্তিক যোগাযোগ প্রযুক্তি ও নিয়মিত প্রশিক্ষণই পারে এই প্রাণহানি কমাতে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী জানান, জেলায় প্রায় এক হাজার ট্রলারের বৈধ অনুমতিপত্র থাকলেও বাস্তবে ১০ হাজারের অধিক ট্রলার সমুদ্রে চলাচল করছে। অনিবন্ধিত ট্রলারগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নজরদারি ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। তবে প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনায় স্থানীয়রা ও নিহতের পরিবার দ্রুত সরকারি সহায়তা, কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা এবং জেলেদের নিরাপত্তার প্রশ্নে কার্যকর ও দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
