পটুয়াখালী জেলার রাঙ্গাবালী বাংলাদেশের একমাত্র দ্বীপ উপজেলা, যেখানে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত রয়েছে দুই লক্ষাধিক মানুষ। তিনদিকে নদী ও একদিকে সাগর দ্বারা বেষ্টিত এই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এখানকার যোগাযোগব্যবস্থা মূলত নৌপথনির্ভর এবং দেশের অন্যান্য অংশের সঙ্গে তা অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। নদী ও বঙ্গোপসাগরের সঙ্গমস্থলে অবস্থিত এই জনপদে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ না থাকায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট একটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে এসে এর নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রায় ৫৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
উন্নত চিকিৎসার জন্য এখানকার লোকজনকে শহরে যেতে হলে পাড়ি দিতে হয় ভয়াল আগুনমুখা নদী। উত্তাল ঢেউ ও তুফান উপেক্ষা করে নদী পারাপার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় জীবন বাজি রেখেই অসুস্থ রোগী ও গর্ভবতী নারীদের শহরে নিতে হয়। মাঝনদীতে অসুস্থ রোগীর মৃত্যু এবং গর্ভপাতসহ অসংখ্য হৃদয়বিদারক ঘটনার সাক্ষী এই উপজেলাবাসী। জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলেও পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল না থাকায় এলাকার বহু মানুষের শেষ ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে ওঝা, কবিরাজ ও পল্লি চিকিৎসকরা।
উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের মধ্যে চারটিতে ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, একটিতে উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং বারোটি ওয়ার্ডে কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে জ্বর, সর্দি ও কাশির মতো সাধারণ রোগের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হলেও সেখানে নেই কোনো এমবিবিএস চিকিৎসক। ফলে সামান্য অসুস্থতাতেও অপচিকুসার শিকার হতে হয় সাধারণ মানুষকে।
স্থানীয় বাসিন্দা তানভীর হাওলাদার তার কষ্টের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করে জানান, বাবার মৃত্যুর কিছুদিন আগে তার শারীরিক অবস্থার ব্যাপক অবনতি ঘটেছিল। কিন্তু রাঙ্গাবালীতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকায় এবং দূরত্ব ও যাতায়াতের নানা সীমাবদ্ধতার কারণে তাকে যথাসময়ে চিকিৎসকের কাছে নেওয়া সম্ভব হয়নি। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, সময়মতো চিকিৎসা পেলে বাবা বেঁচে থাকতেন কি না তা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও, একজন সন্তান হিসেবে তার মনে সবসময় এই প্রশ্নটি থেকে যাবে যে এলাকায় একটি ভালো হাসপাতাল থাকলে হয়তো সংকটময় মুহূর্তে বাবাকে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া যেত।
পল্লী চিকিৎসক ইমরান মাহমুদ জানান, রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া ছাড়া তাদের আর কিছুই করার থাকে না। অনেক সময় উন্নত চিকিৎসার জন্য রোগীদের শহরে যাওয়ার পরামর্শ দিলেও আর্থিক সমস্যা ও দূরত্বের কারণে অনেকেই যেতে পারেন না। এর ফলে ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর ঘটনাও এখানে প্রায়ই ঘটে থাকে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল হাসান জানান, বরাদ্দ না পাওয়ার কারণে রাঙ্গাবালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজ দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। তবে হাসপাতালের বাকি কাজ শেষ করার জন্য এখন নতুন করে টেন্ডার হয়েছে এবং কাজটি দ্রুত সময়ের মধ্যে শেষ করার জন্য তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেন জানান, রাঙ্গাবালী উপজেলার নির্মাণাধীন ৫০ শয্যাবিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি দ্রুত সময়ের মধ্যে শেষ করার জন্য টেন্ডার হয়েছে এবং খুব শিগগিরই কাজ শুরু হবে। বর্তমান সরকার বাংলাদেশের প্রত্যেকটি উপজেলায় ১৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে এবং রাঙ্গাবালী হাসপাতালটি সবার আগে অগ্রাধিকার পাবে, কারণ এখানে কোনো পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল নেই।