মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার সন্ন্যাসীরচর ইউনিয়নের দৌলতপুর এলাকায় ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের কোল ঘেঁষে প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ট্রমা সেন্টারটি উদ্বোধনের তিন বছর পেরিয়ে গেলেও চিকিৎসাসেবা শুরু না হওয়ায় নিজেই যেন মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকা এক পরিত্যক্ত স্থাপনায় পরিণত হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত মানুষের জীবন বাঁচাতে ২০২২ সালের নভেম্বরে তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরীর নামে নির্মিত এই আধুনিক চিকিৎসাকেন্দ্রটি ঘটা করে উদ্বোধন করেছিলেন।
ভবন নির্মাণের আগে কিংবা নির্মাণের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় জনবল ও পরিচালন কাঠামো নিশ্চিত না করায় উদ্বোধনের পর থেকেই হাসপাতালটি কার্যত পড়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ট্রমা সেন্টার পরিচালনার জন্য সাতজন কনসালট্যান্ট, তিনজন অর্থোপেডিক সার্জন, দুজন অ্যানেসথেটিস্ট, দুজন আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা, ১০ জন নার্স এবং ফার্মাসিস্ট, রেডিওগ্রাফার ও টেকনিশিয়ানসহ মোট ৩৪টি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু সেই পদ সৃষ্টির অনুমোদন না পাওয়ায় এবং জনবল না থাকায় হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি।
সরেজমিনে দেখা যায়, ট্রমা সেন্টারের একাধিক ভবন থাকলেও পুরো এলাকা অরক্ষিত এবং কোথাও নিয়মিত পাহারার ব্যবস্থা নেই। ভবনগুলোর চারপাশে আগাছা ও ভেতরে নোংরা পরিবেশ বিরাজ করছে। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় বিভিন্ন স্থানে মরিচা পড়েছে এবং বৈদ্যুতিক সরঞ্জামগুলো নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এরই মধ্যে এসি, ফ্রিজ, টেলিভিশন, পানির মোটর ও স্যানিটারি সামগ্রীসহ বিভিন্ন মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি হয়ে গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর নির্জন এই স্থাপনাটি মাদকসেবী ও জুয়াড়িদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা মনির হোসেন জানান, সন্ধ্যার পর এ পথ দিয়ে চলাচল করতে ভয় লাগে, কারণ সেখানে মাদক ও জুয়ার আসর বসে। আরেক স্থানীয় বাসিন্দা আলেয়া বেগম জানান, সন্ধ্যার দিকে মেয়েকে নিয়ে যাওয়ার সময় তিনি ট্রমা সেন্টারের ভেতরে কয়েকজন যুবককে গান-বাজনা ও নাচ করতে দেখেন এবং বিষয়টি জানতে চাইলে তাকে হুমকি দেওয়া হয়। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সাধারণ সম্পাদক সরোয়ার হোসেন বলেন, ট্রমা সেন্টারটি অনৈতিক কর্মকাণ্ডের আস্তানা হয়ে উঠেছে এবং প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি দ্রুত এটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
মাদারীপুরের সিভিল সার্জন ডা. শরীফুল আবেদীন কমল জানান, ট্রমা সেন্টারটি তাদের কাছে হস্তান্তর করা হলেও পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল এখনো পাওয়া যায়নি এবং জনবল চেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ফাতিমা মাহজাবীন বলেন, জনবল সংকটের কারণে সেখানে নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ করা সম্ভব হয়নি এবং চুরির বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। শিবচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামাল হোসেন জানান, এলাকাটি শহর থেকে কিছুটা দূরে হওয়ায় যাতায়াত কম, তবে বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে এবং মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে যানবাহনের চাপ বাড়ার পাশাপাশি নিয়মিত ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। হাইওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এক বছরে এই মহাসড়কে ১৩৭টি দুর্ঘটনায় ১৩২ জন নিহত হয়েছেন এবং এর আগের এক বছরেও ১৩৫টি দুর্ঘটনায় ১৩১ জন নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। কুতুবপুরে একটি দুর্ঘটনায় একসঙ্গে ১৯ জন নিহত ও ২৫ জন আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। দুর্ঘটনার পর গুরুতর আহতদের ফরিদপুর কিংবা ঢাকায় নিতে হয়, কারণ স্থানীয় পর্যায়ে উন্নত ট্রমা চিকিৎসার সুযোগ না থাকায় আহতদের দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
শিবচর হাইওয়ে থানার ওসি মিজানুর রহমান বলেন, সড়কে আহত রোগীদের চিকিৎসার জন্য গড়ে তোলা হাসপাতালটি এখন অচল ও ভুতুড়ে অবস্থায় পড়ে আছে এবং এটি দ্রুত চালু হলে দক্ষিণাঞ্চলের আহত রোগীদের চিকিৎসাসেবা সহজ হবে। নিয়মিত চলাচলকারী পরিবহন চালক আবুল হাসান ও সোহেল বেপারী জানান, মহাসড়কের পাশে ট্রমা সেন্টার থাকা অত্যন্ত জরুরি, কারণ দুর্ঘটনায় আহত রোগীকে দূরে নিতে নিতে অবস্থা খারাপ হয়ে যায় এবং এটি চালু থাকলে অনেক প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হতো। স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল্লাহ আল ইসলামও রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও জিনিসপত্র চুরির কথা উল্লেখ করে দ্রুত হাসপাতাল চালুর দাবি জানান।
একটি দুর্ঘটনাপ্রবণ মহাসড়কের পাশে মানুষের জীবন বাঁচানোর উদ্দেশ্যে প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ও উদ্বোধিত ট্রমা সেন্টারটি প্রয়োজনীয় জনবল ও অর্থের অভাবে তিন বছরের বেশি সময় ধরে অচল পড়ে রয়েছে। সরকারি এই স্থাপনাটি যেন শেষ পর্যন্ত অর্থের অপচয় ও অব্যবস্থাপনার স্মারক হয়ে না থাকে, সেজন্য আর সময়ক্ষেপণ না করে অবিলম্বে ট্রমা সেন্টারটি চালু করা, নিরাপত্তা জোরদার করে সরকারি সম্পদ রক্ষা এবং মাদক ও জুয়ার আড্ডা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জোরালো দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।