ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার ৪৮টি কমিউনিটি ক্লিনিক দীর্ঘদিনের অবহেলা, অযত্ন ও তদারকির অভাবে চরম বেহাল দশায় পড়ে রয়েছে। চিকিৎসক সংকট, তীব্র ওষুধ ঘাটতি এবং জরাজীর্ণ ভবনের কারণে উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার এই উদ্যোগটি বর্তমানে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় মুখ থুবড়ে পড়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৮ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে উপজেলার ১২টি ইউনিয়নে এই ৪৮টি কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি ক্লিনিক থেকে স্থানীয়রা মা ও শিশু স্বাস্থ্য, প্রজনন স্বাস্থ্য, পরিবার-পরিকল্পনা, টিকাদান ও পুষ্টিবিষয়ক সেবা পাওয়ার কথা। বিশেষ করে মঠবাড়ি, বৈলর, কাঁঠাল, কানিহারী ও রামপুর ইউনিয়নে ক্লিনিকের সংখ্যা বেশি হলেও বহু বছর ধরে কোনো সংস্কার না হওয়ায় অধিকাংশ কেন্দ্রই কার্যকারিতা হারিয়ে ধুঁকছে।
সরেজমিনে বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, বেশিরভাগ ক্লিনিকের ছাদ ও দেওয়ালের প্লাস্টার খসে পড়ছে। বর্ষার মৌসুমে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে মেঝে সিক্ত হয়ে থাকে। অনেক ভবনের দরজা-জানালা ভেঙে গেছে এবং বিদ্যুৎ ও সুপেয় পানির কোনো ব্যবস্থা নেই। শৌচাগারগুলো নষ্ট থাকায় ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে আছে। পর্যাপ্ত আসন না থাকায় নারী ও গর্ভবতী মায়েদের দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে সেবা নিতে হয়। এছাড়া স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকে সরকারিভাবে সরবরাহকৃত ওষুধের কার্টন।
কানিহারী বালিদিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকে অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে সেবা নিতে আসা মারজিয়া খাতুন ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ভবনের ছাদ থেকে পলেস্তারা খসে পড়ে, বৃষ্টি নামলে ভেতরে দাঁড়ানোরও উপায় থাকে না। এখানে গ্যাস্ট্রিক ও প্যারাসিটামল ছাড়া কদাচিৎ অন্য ওষুধ মেলে, বাধ্য হয়ে গ্রামীণ ফার্মেসি থেকে অতিরিক্ত মূল্যে ওষুধ কিনতে হয়। মঠবাড়ি ইউনিয়নের সেবাগ্রহীতা মোস্তাফিজ বলেন, বসার ভালো ব্যবস্থা নেই এবং শৌচাগারের পরিবেশ অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর। সপ্তাহে মাত্র একদিন চিকিৎসক আসেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্বাস্থ্যকর্মী জানান, প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের কাজ করতে হয় এবং নিয়মিত মনিটরিং ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাকর্মী না থাকায় তাদের ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে।
ত্রিশাল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তা জিয়াউল বারী জানান, বর্তমানে ৪৮টি ক্লিনিকের মধ্যে প্রায় ৩০ থেকে ৩২টি ভবনই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এসব জীর্ণ অবকাঠামো ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের জন্য মন্ত্রণালয়ে চাহিদা ও তালিকা পাঠানো হয়েছে। তবে বরাদ্দ সরাসরি স্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হওয়ায় স্থানীয়ভাবে কোনো তহবিল বরাদ্দ পাওয়া যায় না বলে তিনি জানান। ভুক্তভোগী এলাকাবাসী ও সচেতন মহল দ্রুত এসব জরাজীর্ণ ক্লিনিক সংস্কার এবং নিয়মিত চিকিৎসকের উপস্থিতি ও পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন।