মিঠামইন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক ও জনবল সংকটে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা

কিশোরগঞ্জের হাওরবেষ্টিত মিঠামইন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নান্দনিক পরিবেশ ও সৌন্দর্য বজায় থাকলেও তীব্র জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকটে চরম ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। প্রথম দর্শনে কোনো বিনোদন কেন্দ্র বা মনোরম রিসোর্ট মনে হলেও, প্রধান ফটকের জরুরি বিভাগের সাইনবোর্ড আর রোগীদের ভিড়েই মূলত ভেঙে যায় সেই ভুল ধারণা।

গত পাঁচ বছরে আমূল বদলে গেছে এই হাসপাতালটির বাহ্যিক চিত্র। চারদিকে বহুতল ভবন, পশ্চিমে বাঁধানো ঘাটসহ বিশাল পুকুর ও মসজিদ, উত্তরে সারিবদ্ধ আবাসিক ভবন এবং পাকা সরু রাস্তার দু’পাশে সারি সারি দেবদারু ও বাহারি ফুল গাছের মাঝখানের ফলজ ও বনজ বৃক্ষের উদ্যান যে কাউকে বিমোহিত করে। অনুসন্ধানে জানা যায়, ডা. আব্দুল্লাহ আল শাফির ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার ৩৮ বছর পর ২০২২ সালে এই হাওরাঞ্চলে প্রথমবারের মতো বিনামূল্যে প্রসূতিদের অস্ত্রোপচার (সিজার) চালু করা হয়। তবে স্থায়ী অ্যানাস্থেসিয়া ও সার্জারি বিশেষজ্ঞ না থাকায় বর্তমানে নিয়মিত এই সিজারিয়ান কার্যক্রম চালানো সম্ভব হচ্ছে না।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ৩১ জন চিকিৎসকের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১২ জন। অ্যানাস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞ ডা. মরিয়ম আক্তার এক বছরের বেশি সময় ধরে জেলা সদরে প্রেষণে কর্মরত আছেন এবং নেই কোনো গাইনোকোলজিস্টও। একইভাবে ৩১ জন নার্স ও বয়ের মধ্যে কর্মরত আছেন ১৬ জন (যাদের মধ্যে ৩ জন প্রেষণে)। মাঠপর্যায়ে ২০ জন স্বাস্থ্য সহকারীর বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ১১ জন (যাদের মধ্যে ২ জন সাময়িক বরখাস্ত) এবং একমাত্র স্বাস্থ্য পরিদর্শকের পদটিও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে।

এতসব সংকটের মধ্যেও হাসপাতালটির নতুন ভবনের নিচতলায় কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং দ্বিতীয় তলায় শিশুদের উপযোগী নান্দনিক ‘ডে-কেয়ার সেন্টার’ গড়ে তোলা হয়েছে। নানা রঙের খেলনা, পুতুল, দাবাবোর্ড ও রঙিন কাগজের ফুলের ব্যবহারে সাজানো মনমুগ্ধকর এই সেবাকেন্দ্রগুলো স্থানীয়দের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। পাশাপাশি বর্তমান কর্মকর্তার যোগদানের পর রোগীদের সুবিধার্থে ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন, আল্ট্রাসনোগ্রাম ও জিন এক্সপার্ট ল্যাবরেটরিসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্র বাড়ানো হলেও দক্ষ কারিগরি টেকনিশিয়ান না থাকায় নিয়মিত এর সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা।

হাসপাতালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই অপ্রতুলতার মধ্যেও প্রতি মাসে গড়ে ৪ থেকে ৫টি সিজার, ৫০০-র বেশি ভর্তি রোগী, ১ হাজার জরুরি রোগী এবং প্রায় সাড়ে ৬ হাজার মানুষ বহির্বিভাগে সেবা নিচ্ছেন। তবে প্রায় সোয়া লাখ জনসংখ্যা অধ্যুষিত এই জনপদে পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও টেকনোলজিস্ট না থাকায় বিপুল পরিমাণ রোগীকে সেবা দিতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হাঁপিয়ে উঠছেন চিকিৎসকরা।

রোববার বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা ঘাগড়া ইউনিয়নের আমেনা বেগম জানান, তারা গরিব মানুষ হওয়ায় কম টাকায় ভালো চিকিৎসার আশায় এখানে আসেন। কাটখাল ইউনিয়নের হোসেন আলী বলেন, সরকারি হাসপাতালের পরিবেশ এত সুন্দর হতে পারে, তা অন্য কোথাও দেখেননি। টাকা ছাড়াও হাসপাতালে সিজার হয়—তা তাদের জানা ছিল না। সরকার যদি প্রয়োজনীয় জনবলের ব্যবস্থা করত, তবে তাদের চিকিৎসার জন্য আর শহরে দৌড়াতে হতো না। দ্রুত শূন্য পদগুলোতে জনবল পদায়নের জোরালো দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

এ বিষয়ে মিঠামইন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আব্দুল্লাহ আল শাফি বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে তারা সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী নিরলস কাজ করছেন। জনবলসহ নানা সংকট সত্ত্বেও সর্বোচ্চ সেবা দিতে তারা সচেষ্ট রয়েছেন এবং সংকট কাটলে হাওরবাসীকে আরও উন্নত সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।

জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাইদুর রহমান জানান, হাওর অঞ্চলে কর্মকর্তাদের কিছুটা অনীহা রয়েছে। তবে এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হবে না, কারণ ইতিমধ্যে সরকার স্বাস্থ্যবিভাগের বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে লোকবল নিয়োগের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে এবং দ্রুত প্রসূতি সেবার প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও টেকনোলজিস্ট পদায়ন করা হবে।

০%
০%
০%
০%