পরিবর্তন হচ্ছে কমিউনিটি ক্লিনিকের নাম, চিকিৎসক সংকটে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর

দেশের স্বাস্থ্য খাতের বিদ্যমান সংকট নিরসন এবং মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে আগামী ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার দরপত্র আহ্বান করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল। একই সঙ্গে দেশের সব কমিউনিটি ক্লিনিকের নাম পরিবর্তন করে ‘ফ্যামিলি ওয়েলবিয়িং সেন্টার’ করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট দূরীকরণ, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বর্তমান সরকার কাজ করে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন মন্ত্রী।

শনিবার (১৭ জানুয়ারি) সকালে ময়মনসিংহের ফুলপুর ও তারাকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আকস্মিক পরিদর্শন শেষে দুপুরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শনে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এ সময় হাসপাতালের লেবার ওয়ার্ড, গাইনি ওয়ার্ড, হাম আইসোলেশন ও ডেঙ্গু ওয়ার্ডসহ বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখেন তিনি। আকস্মিক এই পরিদর্শনে চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি, অতিরিক্ত রোগীর চাপ, অপরিচ্ছন্নতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং সেবাব্যবস্থার নানা দুর্বলতা ও অব্যবস্থাপনা স্পষ্টভাবে উঠে আসে। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব সমস্যা দ্রুত সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কঠোর নির্দেশনা দেন মন্ত্রী।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসকদের উপস্থিতি যাচাই করতে রেজিস্টার খাতা নিজের হেফাজতে নেন মন্ত্রী। নির্দিষ্ট সময়ে উপস্থিত না থাকা কয়েকজন চিকিৎসকের রোস্টার সংগ্রহ করে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, সকাল ১০টা কিংবা পৌনে ১১টায় কর্মস্থলে উপস্থিত হওয়ার ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দায়িত্ব অবহেলা বা চিকিৎসায় সামান্যতম গাফিলতির প্রমাণ মিললে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। এছাড়া নতুন ভবনের নিচতলায় ময়লা-আবর্জনা ও শৌচাগারের বেহাল দশা দেখে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। গাইনি ওয়ার্ডে এক রোগীকে বাইরে থেকে স্যালাইন কেনার কারণ জানতে পেরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ভর্ৎসনা করার পাশাপাশি নিজ দায়িত্বে ওই রোগীকে স্যালাইন ক্রয়ের জন্য এক হাজার টাকা দেন মন্ত্রী। ডেঙ্গু ওয়ার্ডে মশারির ব্যবস্থা সন্তোষজনক হলেও চিকিৎসাসেবা সম্পর্কে রোগীদের সঠিক তথ্য প্রদানে চিকিৎসকদের আরও দায়িত্বশীল হওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়।

হাসপাতালের ওপর অতিরিক্ত চাপের কথা তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, এক হাজার রোগীর ধারণক্ষমতার বিপরীতে প্রতিদিন এখানে তিন থেকে চার হাজার রোগী সেবা নিতে আসেন। ময়মনসিংহ ছাড়াও আশপাশের আট থেকে দশটি জেলার মানুষ এ হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় চিকিৎসক ও শয্যার ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি হচ্ছে। গত ১৭ বছরের স্বাস্থ্য খাতের ব্যাপক লুটপাট ও অব্যবস্থাপনার কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এগুলো রাতারাতি দূর করা সম্ভব না হলেও পর্যায়ক্রমে সমাধান করা হচ্ছে। জনবল সংকট মোকাবিলায় পাঁচ হাজার নার্স ও ২৫ হাজার মিডওয়াইভ নিয়োগের পাশাপাশি বন্ধ থাকা শিশুদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সেবা এক সপ্তাহের মধ্যে চালুর ঘোষণা দেন তিনি। এছাড়া ফুলপুর ও তারাকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শয্যাসংখ্যা ১০০ থেকে ১৫০টিতে উন্নীত করার পরিকল্পনার কথা জানান।

সরকারি হাসপাতালের আশপাশে গড়ে ওঠা অবৈধ বেসরকারি ক্লিনিক এবং দালাল চক্রের অপতৎপরতা প্রসঙ্গে মন্ত্রী কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, সরকারি হাসপাতালের এক কিলোমিটারের মধ্যে নতুন ক্লিনিক স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এবং বিদ্যমান ক্লিনিকগুলো নিয়মিত মনিটরিং করা হবে। নির্ধারিত শর্ত ভঙ্গ করলে বা রোগীদের সাথে প্রতারণা করলে সেসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা রোধে গণমাধ্যমের ইতিবাচক ভূমিকার প্রশংসা করে মন্ত্রী বলেন, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সঠিক চিত্র সরকারের ভুলত্রুটি সংশোধনে সহায়তা করে।

পরিদর্শনকালে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাকির হোসেন, ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোতাহার হোসেন তালুকদার, বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. প্রদীপ কুমার সাহা, জেলা প্রশাসক সাইফুর রহমান এবং জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসানসহ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা।

০%
০%
০%
০%