বিড়ালের আঁচড়ে জলাতঙ্ক নয় বরং প্যানিক অ্যাটাক হয়েছিল কুষ্টিয়ার শিশুর

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক বিভ্রান্তি ও আলোচনার জন্ম হয়েছে। ভিডিওতে কুষ্টিয়ার এক শিশুকে বিড়ালের মতো ‘মিউ মিউ’ শব্দ করতে দেখা যায়, যার সঙ্গে দাবি করা হয়েছিল পোষা বিড়ালের আঁচড়ের ফলে সে জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়েছে। তবে রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধান ও চিকিৎসকদের সর্বশেষ পর্যবেক্ষণে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, শিশুটি জলাতঙ্কে আক্রান্ত নয়; বরং সে ‘প্যানিক অ্যাটাক’ বা তীব্র আতঙ্কজনিত সমস্যায় ভুগছে।

গত ২০ আগস্ট ‘টাইমস টুডে’ নামক একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে ‘পোষা বিড়ালের আঁচড় খেয়ে অস্বাভাবিক আচরণ বালিকা’ শিরোনামে ভিডিওটি প্রথম প্রচার করা হয়। এরপর চ্যানেল আই, এশিয়া পোস্টসহ আরও কয়েকটি গণমাধ্যম তথ্য যাচাই না করেই ভিডিওটি প্রচার করলে জনমনে ব্যাপক আতঙ্ক ও কৌতূহল ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কণ্ঠে শিশুটিকে রাজশাহী নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিতে শোনা গেলেও, ঘটনার প্রেক্ষাপট বা সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য সেখানে ছিল না। মঙ্গলবার পর্যন্ত ভিডিওটি ২ কোটি ২০ লাখ বার দেখা হয়েছে।

তদন্তে জানা যায়, ভুক্তভোগী শিশুটির নাম মুস্তারীন আদ্রিতা, যার বাড়ি কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলায়। ১৭ আগস্ট সন্ধ্যায় তাকে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়। কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. ইকবাল হোসেন স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, শিশুটির মধ্যে জলাতঙ্কের কোনো ক্লিনিক্যাল লক্ষণ পাওয়া যায়নি। তার মতে, ভয় বা চরম মানসিক চাপ থেকেও শিশুরা অনেক সময় অস্বাভাবিক আচরণ করতে পারে।

ঢাকার মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে শিশুটির প্রকৃত অবস্থা উদ্ঘাটিত হয়। তার মা জানান, দুই বছর ধরে শিশুটি ঠান্ডা ও অ্যাজমার সমস্যায় আক্রান্ত এবং বাসায় পোষা বিড়াল হারিয়ে ফেলার পর থেকেই সে তীব্র আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। চিকিৎসকেরা একে প্যানিক অ্যাটাক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ইউনিসেফের তথ্য ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, তীব্র ভীতি বা মানসিক চাপের সময় শিশুরা অবচেতনভাবে বিভিন্ন অস্বাভাবিক শব্দ বা আচরণ করতে পারে, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানে ‘ডিসোসিয়েশন’ বা বিচ্ছিন্নতাবোধের সঙ্গে সম্পর্কিত।

বিড়ালের আঁচড়ের কারণে কোনো শিশুর কণ্ঠস্বর বদলে বিড়ালের ডাকের মতো হওয়া চিকিৎসাবিজ্ঞানে অসম্ভব একটি দাবি। অথচ পর্যাপ্ত তথ্য যাচাই ছাড়াই ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুটিকে নিয়ে বিদ্রূপ ও ভিত্তিহীন অনুমানের ঝড় ওঠে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো অসুস্থতা বা সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে ভিডিও প্রকাশের আগে ঘটনার সত্যতা এবং চিকিৎসকদের মতামতের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। দায়বদ্ধতাহীন এমন প্রচারণার ফলে একটি শিশুর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি জনমনে চরম বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে।

০%
০%
০%
০%