না ফেরার দেশে কান্ট্রি সংগীতের কিংবদন্তি ডলি পার্টন

কান্ট্রি সংগীতের আকাশে নক্ষত্রপতন। সুরের জাদুকরী, অসামান্য গীতিকার ও কোটি মানুষের হৃদয়ের রানী ডলি পার্টন আর নেই। গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসির ন্যাশভিলের ভ্যান্ডারবিল্ট-ইনগ্রাম ক্যানসার সেন্টারে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেছেন কালজয়ী এই শিল্পী। ৮০ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি ক্যানসারের সঙ্গে স্বল্পমেয়াদী লড়াইয়ের পর না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। তাঁর প্রয়াণে সংগীতবিশ্বে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হলো, যা হয়তো কখনোই পূরণ হওয়ার নয়।
ডলি পার্টন মানেই ছিল এক অনুভূতির নাম। ‘জোলিন’ গানটিতে প্রিয়জনকে হারানোর যে আকুতি, কিংবা ‘আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ’ গানে বিচ্ছেদের যে সুর—সবই ডলির নিজস্ব যাপিত জীবনের প্রতিচ্ছবি। নিজের অভিজ্ঞতাকে অসাধারণ সব গানে রূপান্তর করার জাদুকরী ক্ষমতা ছিল তাঁর। গান শুধু তাঁর পেশা ছিল না, ছিল আত্মিক সাধনা। প্রায় তিন হাজার গান লেখা এই শিল্পী বলতেন, গান লেখার মুহূর্তেই তিনি স্রষ্টার সবচেয়ে কাছাকাছি অনুভব করেন।
১৯৪৬ সালে টেনেসির এক অতি সাধারণ পরিবারে ডলির জন্ম। ১২ ভাই-বোনের অভাবী সংসারের সেই দিনগুলো থেকেই গানের সঙ্গে তাঁর সখ্য। গির্জার সুর আর মায়ের লোকগানে বড় হওয়া ডলি কিশোর বয়সেই স্বপ্নবুকে নিয়ে পাড়ি জমান ন্যাশভিলে। সেই যাত্রায় তাঁর সম্বল ছিল কেবল নিজের লেখা গানের খাতা। অক্লান্ত পরিশ্রম আর অদম্য মেধার জোরে তিনি খুব দ্রুতই কান্ট্রি মিউজিকের অবিসংবাদিত সম্রাজ্ঞী হয়ে ওঠেন।
‘কোট অব ম্যানি কালারস’ গানে শৈশবের দারিদ্র্য আর মায়ের মমতাকে তিনি যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন, তা আজও শ্রোতাদের চোখে জল আনে। অন্যদিকে কর্মজীবী নারীর সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে ‘নাইন টু ফাইভ’ গানটি তাঁকে পৌঁছে দিয়েছিল বিশ্বসংস্কৃতির মূলধারায়। সুরের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি চলচ্চিত্র আর ব্যবসায়ও দেখিয়েছেন সাফল্যের স্বাক্ষর। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিনোদনকেন্দ্র ‘ডলিউড’ আজ বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় এক নাম।
কেবল শিল্পী হিসেবেই নয়, একজন মানবিক মানুষ হিসেবেও ডলি ছিলেন অনন্য। শিশুদের শিক্ষার প্রসারে তাঁর ‘ইমাজিনেশন লাইব্রেরি’ বিশ্বজুড়ে ৩০ কোটিরও বেশি বই পৌঁছে দিয়েছে অভাবী শিশুদের হাতে। মহামারি কিংবা দুর্যোগের সময় তাঁর দানশীল হাত বারবার আর্তমানবতার সেবায় এগিয়ে এসেছে। উজ্জ্বল সাজ, সোনালি চুল আর হাসিঠাট্টায় ভরপুর ডলির ব্যক্তিত্ব ছিল যেকোনো আসরের প্রাণ।
এলভিস প্রিসলির মতো তারকার গানের স্বত্ব না ছেড়ে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকা ডলি পার্টন ছিলেন একাধারে আপসহীন এবং উদার। ১১টি গ্র্যামি পুরস্কার, কান্ট্রি মিউজিক হল অব ফেম এবং রক অ্যান্ড রোল হল অব ফেমে নিজের নাম লিখিয়ে তিনি প্রমাণ করে গিয়েছেন, সুরের কোনো সীমান্ত নেই। জীবনসঙ্গী কার্ল ডিনের মৃত্যুর পর কিছুটা নিভৃতে থাকলেও সৃজনশীল কাজ থেকে দূরে থাকেননি তিনি। আজ ডলি পার্টন নেই, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি করা সুরের অমলিন রেশ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ধ্বনিত হতে থাকবে অনন্তকাল।
