ছেলের শেষ কথোপকথন আর ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী

নব্বইয়ের দশকের বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের আকাশ কাঁপানো এক নাম সালমান শাহ। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সেই নক্ষত্র অকালে ঝরে পড়ার পর কেটে গেছে প্রায় তিন দশক। কিন্তু আজও তাঁর মা নীলা চৌধুরীর হৃদয়ে সেই শোক যেন জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড। ছেলের সঙ্গে শেষবার কথা হয়েছিল ৫ সেপ্টেম্বর। সেই কথোপকথনের প্রতিটি শব্দ আজও নীলা চৌধুরীর কানে প্রতিধ্বনিত হয়। সেদিন মা ছেলেকে নিজের সঙ্গে সিলেটে বিশ্রামের জন্য নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সালমান ক্যারিয়ারের ব্যস্ততা আর মানুষের লগ্নির কথা মাথায় রেখে বলেছিলেন, ‘এত মানুষের লগ্নির ভার আমার ওপর। বিশ্রাম তো দূরের কথা, আমার মরারও সময় নেই আম্মা।’ মাত্র একদিন পরেই যে ছেলে এমন অকাল প্রস্থান বেছে নেবেন, তা আজও কোনো মায়ের পক্ষে মেনে নেওয়া অসম্ভব।
সালমান শাহ এবং নীলা চৌধুরীর সম্পর্ক ছিল গভীর এক বিশ্বাসের জায়গা। নিজের জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ, শুটিংয়ের ব্যস্ততা কিংবা মনের অস্থিরতা—সবই মা-এর সঙ্গে ভাগ করে নিতেন ইমন। নীলা চৌধুরী জানান, সালমান কতটা সংবেদনশীল ছিলেন। শুটিংয়ে তারকা কিংবা এক্সট্রা শিল্পী—কারও সঙ্গেই কোনো ভেদাভেদ করতেন না তিনি। অসচ্ছল সহকর্মীদের তিনি নিয়মিত সাহায্য করতেন এবং অনেককে কাজের সুযোগ করে দিতেন। অথচ এমন প্রাণবন্ত এক মানুষকেই ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হয়েছে বলে নীলা চৌধুরী বিশ্বাস করেন। এমনকি একবার সালমানের শরীরে কামড়ের দাগ দেখে যখন মা জানতে চেয়েছিলেন, তখন সেই অস্থিরতার কারণ হিসেবে তৎকালীন দাম্পত্য জীবনের টানাপোড়েন ও মানসিক হেনস্তার কথা সরলভাবে মা-কে জানিয়েছিলেন তিনি।
ছেলেকে হারানোর পর থেকে নীলা চৌধুরীর জীবন থমকে দাঁড়িয়েছে। লন্ডন থেকে দেশের আনাচে-কানাচে, যেখানেই থাকুন না কেন, ইমনের স্মৃতিই তাঁর বেঁচে থাকার অবলম্বন। ছেলের গলা থেকে খুলে রাখা চার ভরি ওজনের সেই সোনার চেইনটি আজও আগলে রাখেন তিনি। নীলা চৌধুরীর কাছে এটি কেবল অলংকার নয়, বরং তাঁর প্রিয় ইমনের স্পর্শের শেষ চিহ্ন। ছেলের অসমাপ্ত সিঙ্গাপুর-ব্যাংকক ভ্রমণের পরিকল্পনা, শপিংয়ের মুহূর্ত কিংবা দুপুরের খাবার খাওয়ার সময়টুকুও এখন শুধুই স্মৃতি। আর এই স্মৃতির ভিড়ে বারবার ফিরে আসে সেই প্রশ্ন—কেন তাঁর ছেলেকে কেড়ে নেওয়া হলো?
দীর্ঘ ২৯ বছর পর সালমান শাহর মৃত্যুর মামলা নতুন মোড় নিয়েছে। সম্প্রতি খল অভিনেতা ডন হক গ্রেপ্তার হওয়ার পর বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে আশায় বুক বেঁধেছেন নীলা চৌধুরী। মামলাটি বর্তমানে সিআইডি তদন্ত করছে এবং তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ৩০ আগস্ট দিন ধার্য করা হয়েছে। নীলা চৌধুরীর দাবি, প্রধান আসামিসহ যারা এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তাদের সবাইকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হোক। বিচার না হওয়া পর্যন্ত এই শোকাতুর মা অবিচল। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, ছেলের হত্যার ন্যায়বিচার দেখাই এখন তাঁর জীবনের একমাত্র ব্রত। ইমনের প্রতিটি স্মৃতি এবং মা হিসেবে পাওয়া অসীম যন্ত্রণাই তাঁকে আজও লড়াই করার শক্তি জোগায়।
