সাবেক প্রেমিকাকে ফাঁসাতে ডেপুটি মার্শালের সাজানো নাটক ও সত্য উদ্ঘাটনের আখ্যান আ টক্সিক লাভ স্টোরি

নেটফ্লিক্সের পর্দায় মুক্তি পাওয়া ‘আ টক্সিক লাভ স্টোরি’ তথ্যচিত্রটি যেন এক শ্বাসরুদ্ধকর মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার, যা বাস্তব জীবনের নিষ্ঠুরতাকে ছাপিয়ে গেছে বহুগুণ। ভালোবাসা, প্রতিশোধ এবং ক্ষমতার জঘন্য অপব্যবহারের এক অবিশ্বাস্য আখ্যান নিয়ে নির্মিত এই ডকুমেন্টারি দর্শককে ভাবিয়ে তুলছে নতুন করে। ক্যালিফোর্নিয়ার সাবেক ডেপুটি ইউএস মার্শাল ইয়ান ডিয়াজ এবং তাঁর স্ত্রী অ্যাঞ্জেলা ডিয়াজ মিলে কীভাবে একজন নির্দোষ নারীকে ধ্বংস করার নীলনকশা তৈরি করেছিলেন, তার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০১৬ সালে, যখন ইয়ান ও অ্যাঞ্জেলা পুলিশকে অভিযোগ করেন যে, ‘লিলিথ ইজ ট্রুথ’ ছদ্মনামের কোনো এক ব্যক্তি তাঁদের নানাভাবে হুমকি দিচ্ছেন এবং ধর্ষণের ফাঁদ পেতেছেন। সেই সময় মিশেল হ্যাডলি নামক ইয়ানের এক সাবেক প্রেমিকাকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করতে তাঁরা পুলিশের সামনে এক সুনিপুণ নাটক সাজান। ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত আবেগের জটিল সমীকরণ ব্যবহার করে মিশেলকে এমনভাবে ফাঁসানো হয়েছিল যে, পুলিশ বিন্দুমাত্র সন্দেহ না করেই তাঁকে গ্রেপ্তার করে। দীর্ঘ ৮৮ দিন অন্ধকার কারাগারে কাটাতে হয় মিশেলকে, অথচ তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ নিরপরাধ।
তদন্তের গভীরে প্রবেশ করতেই বেরিয়ে আসে ভয়াবহ সব তথ্য। ফরেনসিক ল্যাবে আইপি ঠিকানা বিশ্লেষণ এবং ইয়ানের সরকারি ল্যাপটপের গোপন নথিপত্র খতিয়ে দেখে গোয়েন্দারা হতবাক হয়ে যান। জানা যায়, মিশেলকে ফাঁসানোর প্রতিটি ই-মেইল এবং অনলাইন বিজ্ঞাপন খোদ ইয়ান ও অ্যাঞ্জেলার ঘর থেকেই পাঠানো হয়েছিল। নিজের নিয়ন্ত্রণপ্রিয় স্বভাবের কারণে মিশেলকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না ইয়ান। সম্পর্কের বাঁধন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসা মিশেলকে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করাই যেন ছিল এই দম্পতির প্রধান লক্ষ্য।
২০১৭ সালে অ্যাঞ্জেলা আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করে নিলে মিশেলের ওপর থেকে সব অভিযোগ তুলে নেওয়া হয়। এরপর বিচারের দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় ২০২১ সালে ইয়ান ডিয়াজকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ২০২৩ সালে তাঁকে ১০ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। ফেডারেল তদন্তে বাধা, সাইবার স্টকিং এবং মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার মতো গুরুতর অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন এই সাবেক সরকারি কর্মকর্তা। দীর্ঘ এই আইনি লড়াইয়ের পর মিশেল হ্যাডলি এখন অ্যানাহাইম পুলিশ বিভাগের বিরুদ্ধেও মামলা করেছেন, কারণ যথাযথ তদন্তের অভাবই তাঁকে বছরের পর বছর এই চরম ভোগান্তিতে ফেলেছিল।
তথ্যচিত্রটির শেষ দৃশ্যে মিশেলকে এক ভিন্নরূপে দেখা যায়। সব অন্ধকার কাটিয়ে তিনি এখন এক কন্যাসন্তানের গর্বিত মা। নিজের জীবনের নতুন এই অধ্যায় নিয়ে মিশেল দৃপ্ত কণ্ঠে বলেন, ‘আমি কোনো রূপকথার রাজকুমারী নই, কিন্তু নিজের গল্পের প্রকৃত নায়িকা হতে পেরেছি।’ দীর্ঘদিনের মানসিক নির্যাতন ও এক পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে মিশেলের এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পটিই যেন এই ডকুমেন্টারির সবচেয়ে শক্তিশালী এবং অনুপ্রেরণাদায়ক বার্তা।