মহানায়ক উত্তমকুমারের ৪৪তম প্রয়াণ দিবসে দুই বাংলার শ্রদ্ধার্ঘ্য ও চিরস্মরণীয় উত্তরাধিকার

বাংলা চলচ্চিত্রের আকাশে এমন এক নক্ষত্র, যার দ্যুতি চার দশক পেরিয়েও অমলিন। তিনি শুধু রুপালি পর্দার নায়ক নন, বরং বাঙালির আবেগ ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ— মহানায়ক উত্তমকুমার। গতকাল ২৪ জুলাই ছিল কিংবদন্তি এই অভিনেতার ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। এই বিশেষ দিনে কলকাতার কেওড়াতলা মহাশ্মশানে তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে ভিড় করেছিলেন অসংখ্য ভক্ত, গুণী শিল্পী ও সংস্কৃতিসেবীরা। দুই বাংলার আকাশ-বাতাস যেন আবারও মুখর হয়ে উঠেছিল সেই চিরচেনা জাদুকরের স্মৃতিচারণায়।
১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর উত্তর কলকাতার আহিরীটোলায় অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম। সংসারের টানাপোড়েনের কারণে সাধারণ কেরানির চাকরি করতে হলেও অভিনয়ের নেশা তাঁকে কখনোই ছাড়েনি। কিন্তু শুরুর পথটা ছিল কন্টকাকীর্ণ। একের পর এক সিনেমা মুখ থুবড়ে পড়ায় স্টুডিওপাড়ায় তাঁকে শুনতে হতো ‘ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’-এর মতো তকমা। তবুও অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে তিনি ভেঙে পড়েননি। পাহাড়ী সান্যালের দেওয়া পরামর্শে ‘অরুণ’ থেকে ‘উত্তম’ হয়ে ওঠার সেই সিদ্ধান্তই পাল্টে দিয়েছিল বাংলা সিনেমার ভাগ্যাকাশ।
১৯৫৩ সালে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ সিনেমাটি মুক্তি পাওয়ার পর সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তাঁর জুটি ইতিহাস তৈরি করে। এরপর ‘হারানো সুর’, ‘সপ্তপদী’, ‘নায়ক’ কিংবা ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’—প্রতিটি চরিত্রেই তিনি নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন। প্রায় দুই শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করা এই নক্ষত্র শুধু অভিনেতা ছিলেন না, ছিলেন পরিচালক, প্রযোজক ও সুরকার। সত্যজিৎ রায়ের মতো বিশ্বনন্দিত নির্মাতা থেকে শুরু করে সহশিল্পী সুচিত্রা সেন—সবাই একবাক্যে স্বীকার করেছেন তাঁর সহজাত অভিনয়ের অসাধারণ শক্তির কথা। সংলাপের উচ্চারণ, চোখের চাহনি আর গাম্ভীর্যপূর্ণ নীরবতায় তিনি দর্শকদের যে সম্মোহনে বেঁধে রাখতেন, তা আজও অতুলনীয়।
১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই মাত্র ৫৩ বছর বয়সে তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেও, উত্তমকুমার কোনোদিন অতীত হননি। ওটিটি প্ল্যাটফর্মের নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছে কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় তাঁর উপস্থিতি আজও সমান প্রাসঙ্গিক। অভিনয়ের সহজাত দর্শন দিয়ে তিনি যে মানদণ্ড তৈরি করে দিয়ে গেছেন, তা আজও বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য এক চিরন্তন উত্তরাধিকার। মহানায়ক কোনো নির্দিষ্ট সময়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ নন; তিনি বেঁচে আছেন বাঙালির হৃদয়ে, প্রতিটি সিনেমা আর কোটি মানুষের ভালোবাসায়।