নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার লোহাচূড়া গ্রামে পরিবেশবান্ধব কালো সৈনিক পোকা (ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই) চাষ করে বাণিজ্যিকভাবে বিষমুক্ত মাছ উৎপাদনে এক যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করেছেন শারীরিক প্রতিবন্ধী তরুণ নাহিদ হোসেন। পিকেএসএফের স্মার্ট প্রকল্পের কারিগরি সহযোগিতা এবং স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা ‘মৌসুমী’র নিবিড় তত্ত্বাবধানে এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করে এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন তিনি। ইতোমধ্যে নিজের পুকুরে মাছের উচ্চ আমিষসমৃদ্ধ বিকল্প খাদ্য হিসেবে এই পোকা ব্যবহার করে একদিকে যেমন উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এনেছেন, অন্যদিকে উদ্বৃত্ত পোকা বিক্রি করে প্রতি মাসে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন।
উদ্যোক্তা নাহিদ হোসেন জানান, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা ‘মৌসুমী’ থেকে তার বাবার নামে এক লাখ টাকা ঋণ গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে স্মার্ট উপ-প্রকল্প থেকে ৫০ হাজার টাকার আর্থিক অনুদান পেয়ে খামারটি আরও প্রসারিত করেন তিনি। বর্তমানে তার এই খামারে দুজনের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বাসাবাড়ি ও বাজারের উচ্ছিষ্ট ময়লা-আবর্জনা এবং জৈব বর্জ্য পুনঃব্যবহারের মাধ্যমে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট ধাপে মাত্র ১৫ থেকে ১৬ দিনে উৎপাদিত হয় এই পোকা। আলো-বাতাসপূর্ণ একটি ঘরে উৎপাদিত এই পোকা চাষে আলাদা কোনো দামি খাবারের প্রয়োজন হয় না। প্রতি কেজি কালো সৈনিক পোকা উৎপাদনে তার প্রায় ৬৫ টাকা খরচ হলেও বাজারে তা ২৫০ থেকে ২৭০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি মাসে তার খামারে ৪০০ থেকে ৫০০ কেজি পোকা উৎপাদিত হচ্ছে। কঠোর পরিশ্রম ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে তিনি আজ এলাকায় ‘ব্ল্যাক সোলজার নাহিদ’ নামে পরিচিতি লাভ করেছেন।
স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা মৌসুমী স্মার্ট-পিসিকালচার উপ-প্রকল্পের এমআইএস ও ডকুমেন্টেশন কর্মকর্তা আব্দুর রউফ বলেন, নাহিদ হোসেন আমাদের প্রকল্পের একটি অনন্য ও উজ্জ্বল উদাহরণ। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে তিনি যেভাবে এই পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তার এই সাফল্য দেখে এলাকার অন্য বেকার যুবকরাও খামার গড়তে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন।
প্রকল্প ব্যবস্থাপক ফিরোজ হোসেন জানান, কালো সৈনিক পোকার লার্ভা বিভিন্ন জৈব বর্জ্য ভক্ষণ করে বেড়ে ওঠে এবং আবর্জনা রিসাইকেল প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট ক্ষতিকর গ্রিনহাউস গ্যাস শোষণ করে পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া পরিণত কালো সৈনিক পোকা মাছের খাবারে প্রোটিনের বিকল্প ও সাশ্রয়ী উৎস হিসেবে কাজ করে।
রাণীনগর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা পলাশ চন্দ্র দেবনাথ বলেন, মাছ চাষে বিকল্প প্রোটিনের উৎস হিসেবে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত এই প্রযুক্তি নাহিদ সফলভাবে প্রয়োগ করে দারুণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। শুকনো অবস্থায় এই পোকার লার্ভা থেকে প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চমানের প্রোটিন পাওয়া সম্ভব, যা মাছের দ্রুত বৃদ্ধিতে সহায়ক এবং খামারিদের খাদ্য ব্যয় কমায়। উপজেলা মৎস্য দপ্তরের পক্ষ থেকে এই ধরনের পরিবেশবান্ধব ও লাভজনক উদ্যোগকে সবসময় সার্বিক উৎসাহ ও প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে।