অন্য জেলায় গিয়ে এখতিয়ারবহির্ভূত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা: চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রশাসনের আইনি বিপত্তি

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিজ জেলার সীমানা ছাড়িয়ে অন্য জেলায় এখতিয়ারবহির্ভূতভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্ক ও আইনি প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের এই ভূমিকায় প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

গত বৃহস্পতিবার রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোল উপজেলার ভেরেন্ডি বাজারসংলগ্ন এলাকায় একটি অভিযান পরিচালিত হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাব্বির আহমেদ রোবেলের নেতৃত্বে পরিচালিত ওই অভিযানে অনুমোদন ছাড়া তেল মজুতের অভিযোগে মো. হুমায়ুন চৌধুরী নামের এক ব্যবসায়ীকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা এবং ১৫ ব্যারেল ডিজেল জব্দ করা হয়। ওই ব্যবসায়ী নওগাঁ জেলার নিয়ামতপুর উপজেলার মুন্দিখৈর গ্রামের ‘চৌধুরী ট্রেডিং’-এর মালিক। তবে যে গোডাউনটিতে এই অভিযান চালানো হয়, তার প্রকৃত ভৌগোলিক অবস্থান পার্শ্ববর্তী নওগাঁ জেলার নিয়ামতপুর উপজেলার রসুলপুর ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত।

অভিযানের সময় গোডাউনের মালিকের স্বজনরা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে মৌখিকভাবে জানান যে গোডাউনটি নওগাঁ জেলার সীমানার মধ্যে অবস্থিত। কিন্তু সেই আইনি সীমানা ও আপত্তির বিষয়টি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। মোবাইল কোর্ট আইন অনুযায়ী, যেকোনো নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কেবল তাঁর নিজ অধিক্ষেত্রের ভেতরেই আদালত পরিচালনা ও দণ্ড প্রদানের এখতিয়ার রাখেন। ফলে অন্য জেলার সীমানায় ঢুকে এই সাজা প্রদান ও মালামাল জব্দের ঘটনা আইনি বৈধতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে।

ঘটনার পরদিন শুক্রবার দুপুরে জব্দকৃত ডিজেল উদ্ধার করতে গিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসন আইনি মারপ্যাঁচে পড়ে। ওই সময় নিয়ামতপুরের গোডাউনটির সামনে নাচোল ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম ও গ্রাম পুলিশকে পাহারায় বসে থাকতে দেখা যায়। প্যানেল চেয়ারম্যান জানান, ম্যাজিস্ট্রেট তাকে সকালেই গোডাউন থেকে ডিজেল এনে ধানসুরা ফিলিং স্টেশনে পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু ঘটনাস্থলে গিয়ে গোডাউনটি নিয়ামতপুরের ভেতরে অবস্থিত দেখতে পাওয়ার বিষয়টি জানানোর পর তাকে সেখানে অবস্থান করতে বলা হয় এবং জানানো হয় যে নওগাঁ জেলা প্রশাসন এসে তেল হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শেষ করবে।

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী হুমায়ুন চৌধুরীর ছেলে শিফাত চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান যে তাদের ১০টি গাড়ি চালানোর সুবিধার্থেই এই তেল রাখা হয়েছিল, বিক্রির উদ্দেশ্যে নয় এবং তাদের নামে নওগাঁ জেলা প্রশাসনের বিস্ফোরক লাইসেন্সও রয়েছে। গোডাউনটি অন্য জেলায় অবস্থিত মর্মে বারবার বলার পরও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তা শোনেননি। এদিকে এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাব্বির আহমেদ রোবেলের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল ধরেননি এবং বার্তা পাঠানোর পর কোনো উত্তর না দিয়ে মুঠোফোন বন্ধ করে দেন।

নিয়ামতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুর্শিদা খানম বলেন যে তাদের প্রশাসনিক এলাকায় অন্য কোনো জেলা এসে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছে—এ বিষয়ে তাদের আগে থেকে কিছুই জানানো হয়নি। অন্যদিকে এই আইনি জটিলতার কথা স্বীকার করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আনিসুর রহমান জানান যে বিষয়টি নিয়ে নওগাঁ জেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে এবং নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় তেল উদ্ধারের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

০%
০%
০%
০%