বিশ্ব ফুটবলের আসরে ইরান যখন চমকপ্রদ ক্রীড়া নৈপুণ্য প্রদর্শন করছে, ঠিক সেই সময়ে সুইজারল্যান্ডে ইরানি কূটনীতিকদের কূটনৈতিক তৎপরতা এবং ওয়াশিংটনের নীতি পরিবর্তনের ফলে তেহরানের অর্থনীতির মোড় ঘুরতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ আগামী ৬০ দিনের জন্য ইরানি খনিজ তেল উৎপাদন, বিক্রয় ও সরবরাহের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার ঘোষণা দিয়েছে। চার দশকের মার্কিন নীতিতে এই অভাবনীয় পরিবর্তন ইরান সরকারকে তাৎক্ষণিক স্বস্তি দেওয়ার পাশাপাশি দেশটিকে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
১৯৭৯ সালের জিম্মি সংকট পরবর্তী সময়ে ১৯৮০ সালে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরানি তেল আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। পরবর্তীতে ওবামা প্রশাসনের সময় পারমাণবিক চুক্তির আওতায় কিছু পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করা হলেও ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে তা পুনরায় কঠোর করা হয়। তবে এবারের ছাড় অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিকতর বিস্তৃত। নতুন লাইসেন্সে কোনো শর্তারোপ না করায় মার্কিন শোধনাগারগুলো এখন সরাসরি পারস্যের পেট্রোলিয়াম ক্রয় এবং ডলারে লেনদেন করতে সক্ষম হবে, যা ১৯৭৯ সালের কঠোর বিধিনিষেধকে কার্যত অকার্যকর করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটনের এই উদারতার পেছনে হরমুজ প্রণালির ভূ-রাজনীতি ও বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণের কৌশলগত উদ্দেশ্য রয়েছে। জ্বালানি উপদেষ্টা মিশেল ব্রোহার্ডের ধারণা, এই পদক্ষেপ বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বাড়িয়ে দাম কমাতে সহায়তা করবে। তবে বাস্তবে রপ্তানি বৃদ্ধির হার এখনো চ্যালেঞ্জিং। মে মাসে ইরানের তেল রপ্তানি শূন্যের কোঠায় থাকলেও বর্তমানে তা দৈনিক ১৫ লাখ ব্যারেলে উন্নীত হয়েছে। তা সত্ত্বেও যুদ্ধের আগের দৈনিক ২০ লাখ ব্যারেলের গড় রপ্তানিতে পৌঁছাতে ইরানকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।
নতুন ক্রেতা আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে ব্যাংকিং, বীমা এবং কমপ্লায়েন্স সংক্রান্ত জটিলতা এখনো প্রধান অন্তরায় হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। চীন দীর্ঘদিন ধরে ইরানের তেলের প্রধান ক্রেতা হলেও এখন জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ভারতের মতো দেশগুলো পুনরায় বাজার মূল্যায়নের সুযোগ পাচ্ছে। তবে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেলের সঙ্গে দামের ভারসাম্য বজায় না থাকায় অতিরিক্ত তেল কেনায় ক্রেতাদের মধ্যে কিছুটা দ্বিধা রয়েছে। একই সঙ্গে ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকায় পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর জন্য বড় ধরনের বিনিয়োগ এখনো ঝুঁকিপূর্ণ।
হরমুজ প্রণালির কৌশলগত নিরাপত্তার বিষয়টিও এখনো অনিশ্চয়তার দোলাচলে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিনিময়ে এই নৌপথ খোলা রাখার প্রত্যাশা করলেও তেহরান উল্টো প্রণালিটি নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা দিয়েছে। এতে মার্কিন প্রশাসনের প্রত্যাশিত সুফল অর্জনে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। তবে লজিস্টিক ও লেনদেনের বাধা দূর হওয়ায় ইরানি তেল কোম্পানিগুলো এখন অধিকতর মুনাফা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে এবং দেশটির স্থবির হয়ে থাকা উৎপাদন ব্যবস্থা পুনরায় গতি পেয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদী সম্ভাবনার বিশ্লেষণে দেখা যায়, যদি এই লাইসেন্সের মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানো হয়, তবে ইরান বিশ্ববাজারে আরও বৈচিত্র্যময় ক্রেতা খুঁজে পাবে। ট্রানজিট ফি থেকে আয়, অবরুদ্ধ সম্পত্তি পুনরুদ্ধার এবং ট্রাম্পের প্রতিশ্রুত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ তহবিলসহ নানাবিধ আর্থিক প্রবাহ যুক্ত হলে আগামী এক দশকের মধ্যে ইরান পারস্য উপসাগরের অন্যতম শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।