মূল্যস্ফীতির শঙ্কায় তিন দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ সুদহার বাড়াল জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় সুদের হার বাড়িয়েছে জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংক অব জাপান (বিওজে) তাদের নীতি নির্ধারণী সুদহার বাড়িয়ে ১ শতাংশে উন্নীত করেছে, যা গত তিন দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। মঙ্গলবার ব্যাংকটির নীতিনির্ধারণী পর্ষদের ৭-১ ভোটে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মাধ্যমে কয়েক দশক ধরে চলমান অতি-নমনীয় ঋণ নীতি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরে আসার প্রক্রিয়া আরও জোরদার করল বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতিটি।

১৯৯৫ সালের পর এবারই প্রথম জাপানের নীতি নির্ধারণী সুদের হার এই সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হলো। দেশটির দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্থবিরতা দূর করার লক্ষ্যে দীর্ঘকাল ধরে নামমাত্র সুদের হার বজায় রাখার যে নীতি চালু ছিল, নতুন এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তা থেকে চূড়ান্ত প্রস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ব্যাংক অব জাপান এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, দেশে মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি থাকলেও জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান দামের কারণে ব্যবসায়িক লেনদেনের ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত প্রায় সব ধরনের পণ্যের বাজারদর বাড়িয়ে দিতে পারে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা ঊর্ধ্বমুখী থাকায় ভোক্তা মূল্যসূচক ব্যাংকটির নির্ধারিত ২ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। উল্লেখ্য, বর্তমান সংকটের পূর্বে জাপান তার প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করত। ফলে বৈশ্বিক ভূরাজনীতি ও জ্বালানি তেলের মূল্যের যেকোনো আকস্মিক ওঠানামা দেশটির অর্থনীতির ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

জ্বালানির মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার বেশ কিছু কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে দেশটির জরুরি কৌশলগত তেল মজুদ ব্যবহার এবং সাধারণ নাগরিকদের গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিলের ওপর সরাসরি ভর্তুকি প্রদান অন্যতম। সরকারের এসব সময়োপযোগী উদ্যোগের ফলে গত এপ্রিল মাসে জাপানের খাদ্যবহির্ভূত মূল ভোক্তা মূল্যসূচক মাত্র ১.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা গৃহস্থালির ওপর জ্বালানি ব্যয়ের চাপ অনেকাংশেই হ্রাস করেছে।

আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইএনজি-র দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান বিষয়ক প্রধান অর্থনীতিবিদ মিন জু কাং এই সিদ্ধান্তকে জাপানের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক একটি রূপান্তর হিসেবে অভিহিত করেছেন। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন তাদের নির্ধারিত ২ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পুরোপুরি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে। ফলে দীর্ঘ ১৭ বছর পর ২০২৪ সালের মার্চে মাইনাস ০.১ শতাংশ সুদের হার থেকে বেরিয়ে আসার যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা এখন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরছে।

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে আবাসন ও সম্পদের বুদবুদ ফেটে যাওয়ার পর দীর্ঘকাল ধীরগতির প্রবৃদ্ধি ও মন্দার কবলে পড়েছিল জাপান, যা ইতিহাসে দেশটির 'হারানো দশক' হিসেবে পরিচিত। যদিও বিগত সরকারগুলোর নানা প্রচেষ্টা সত্ত্বেও অর্থনীতির আশানুরূপ ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হয়নি, তবে সাম্প্রতিক সূচকগুলো ইতিবাচক সংকেত দিচ্ছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে দেশটির বার্ষিক মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বেড়েছে ২.১ শতাংশ, যা গত ছয় প্রান্তিকের মধ্যে দ্রুততম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রমাণ।

০%
০%
০%
০%