AdvertisementAdvertisement

অর্থনীতি স্থিতিশীল করে পদ ছাড়লেন আহসান মনসুর

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের নেপথ্যে কোনো পূর্ব-পরিকল্পনা বা উচ্চাভিলাষ ছিল না অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুরের। ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের কাছ থেকে প্রস্তাব পাওয়ার পর তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, দেশের সংকটময় মুহূর্তে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। অতীতে শেখ হাসিনা সরকারের আমলেও একই ধরনের প্রস্তাব এলেও তখন তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, কারণ সে সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনভাবে কাজ করার কোনো পরিবেশ ছিল না। তৎকালীন গভর্নর ফজলে কবিরের মেয়াদ বৃদ্ধিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্ডারের সংশোধনীই ছিল সেই অগণতান্ত্রিক পরিবেশের প্রমাণ।

দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংককে যে ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল, তার বর্ণনা দিতে গিয়ে আহসান এইচ মনসুর জানান, পরিস্থিতির ভয়াবহতা তার প্রাথমিক ধারণাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি—অর্থাৎ প্রায় ৩৫ থেকে ৩৬ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছিল। সেই সঙ্গে বিদেশি পরিশোধের বকেয়া ৩৫০ থেকে ৪০০ কোটি মার্কিন ডলারের এলসি এবং বিদ্যুৎ খাতের বিপুল দায়বদ্ধতা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতাকে চরম সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। সেই সময়ে তার প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং রিজার্ভের ক্ষয় রোধ করা।

Advertisement
বিজ্ঞাপন

ব্যাংক খাতের সুশাসন নিশ্চিতে তিনি ১৪টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনসহ নীতিসুদ বা পলিসি রেট ৮ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করার মতো সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। তবে মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার বিষয়টি তিনি মৃদু ব্যর্থতা হিসেবেই স্বীকার করেন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার বিতর্কে তিনি সতর্ক অবস্থান নিয়েছিলেন, যাতে হুট করে ডলারের দাম উন্মুক্ত করার ফলে শ্রীলঙ্কা বা পাকিস্তানের মতো চরম অস্থিরতা তৈরি না হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার বিষয়ে তিনি বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় এখানে কর্মকর্তাদের বেতনকাঠামো অত্যন্ত অসামঞ্জস্যপূর্ণ, যা মেধাবী ও দক্ষ জনবল আকর্ষণে বড় বাধা। তিনি দীর্ঘমেয়াদী সংস্কারের লক্ষ্যে ‘সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি’ (ডামা) এবং অর্থঋণ আদালত অধ্যাদেশের খসড়া তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ইসলামি ব্যাংকসহ পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করার সিদ্ধান্তটি ছিল তার সময়ের সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ, যার সাফল্য নির্ভর করবে সরকারের পরবর্তী কার্যকর পদক্ষেপের ওপর।

Advertisement
বিজ্ঞাপন

পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংক ও বিভিন্ন দেশের সহায়তায় যৌথ তদন্ত দল গঠন এবং ১৩টি আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার প্রক্রিয়াটি ছিল তার সময়কার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তিনি স্পষ্ট করেন যে, রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন, দ্বৈত শাসন বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিলুপ্তকরণ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন সম্ভব নয়।

অবশেষে, গভর্নর পদ থেকে দায়িত্ব অবসানের প্রতিক্রিয়ায় আহসান এইচ মনসুর কোনো তিক্ততা প্রকাশ করেননি। তিনি মনে করেন, সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল করা এবং রিজার্ভের সক্ষমতা বৃদ্ধি করার যে ভিত্তি তিনি তৈরি করে দিয়ে গেছেন, তা বর্তমান সরকার যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই দেশ এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। তার মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সংস্কার বাস্তবায়নই এখন বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হওয়া উচিত।

0%
0%
0%
0%