মানুষের অজান্তেই সাইবার হামলার চেষ্টা: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নজিরবিহীন নিরাপত্তা ঝুঁকি শনাক্ত করল ব্রিটিশ সংস্থা

যুক্তরাজ্যের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক নিরাপত্তা তদারকি সংস্থা ‘এআই সেফটি ইনস্টিটিউট’ (এআইএসআই) প্রকাশ করেছে যে, সাম্প্রতিক এক নিরাপত্তা পরীক্ষায় বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই এবং অ্যানথ্রোপিকের তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মডেলগুলো মানুষের কোনো নির্দেশনা ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষতিকর সাইবার হামলায় জড়িয়ে পড়েছে। গত মঙ্গলবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানায়, ‘জিপিটি-৫.৬-সল’ এবং ‘মাইথোস ৫’ নামক মডেল দুটি প্রকৃত মানুষ ও বিভিন্ন সংস্থাকে লক্ষ্য করে অত্যন্ত চতুরতার সাথে অননুমোদিত এবং ক্ষতিকারক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে, যা প্রযুক্তি বিশ্বে নতুন করে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, একটি সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত জটিলতা সমাধানের দায়িত্ব দেওয়া হলে মোট ১২২টি পরীক্ষার মধ্যে ১০টিতেই মডেল দুটি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ও অননুমোদিত পদক্ষেপ নেয়। এআইএসআই মোট ১৯টি এই ধরনের অননুমোদিত কার্যকলাপ শনাক্ত করেছে, যার মধ্যে ১৭টি পদক্ষেপই একাই নিয়েছে অ্যানথ্রোপিকের তৈরি মডেল ‘মাইথোস ৫’। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর ঘটনাটি ঘটে যখন মডেলটি কোনো মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই গিটহাব প্ল্যাটফর্মের একটি ওপেন-সোর্স প্রকল্পে ক্ষতিকারক কোড ঢোকানোর চেষ্টা করে।
এই সাইবার হামলার অংশ হিসেবে ‘মাইথোস ৫’ ইন্টারনেটে ভুয়া পরিচয় তৈরি করে এবং প্রকল্পের মূল পরিচালনাকারীকে সেই ক্ষতিকর কোডটি গ্রহণ করতে প্ররোচিত করার চেষ্টা করে। ২০২৩ সালে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এআইএসআই জানায়, প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণকারী সেই ক্ষতিকর কোড অনুমোদন করতে অস্বীকৃতি জানানোয় এই হামলার প্রচেষ্টাটি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। সংস্থাটি জোর দিয়ে বলেছে যে, এটিই প্রথমবার যখন কোনো এআই মডেল বাস্তব বিশ্বে মানুষের সাহায্য ছাড়াই কোনো প্রকৃত ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে এত উচ্চমাত্রার জালিয়াতি বা প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে।
উদ্বেগজনক এই আচরণ সত্ত্বেও তদন্তকারী সংস্থাটি সতর্ক করে জানিয়েছে যে, এই ফলাফলগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বিবেচনা করা উচিত। পরীক্ষাটি কিছু নির্দিষ্ট শর্তের অধীনে চালানো হয়েছিল, যেখানে এআই মডেলগুলোর কিছু নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় বা বন্ধ রাখা হয়েছিল। সংস্থাটি আরও জানায়, এআই মডেলগুলো আসলে কখন বুঝতে পেরেছে যে তারা বাস্তব বিশ্বে কাজ করছে নাকি কোনো কাল্পনিক পরীক্ষার মধ্যে রয়েছে, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি এবং এ বিষয়ে বিশ্লেষণ চলমান রয়েছে।
এই ঘটনার পর প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক জানিয়েছে যে, তারা নিজস্ব তদন্তের অংশ হিসেবে এআইএসআই-এর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে, তাদের এআই চ্যাটবট ‘ক্লড’-এর কার্যকারণ ও চিন্তার প্রক্রিয়া পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের মূল উৎস খুঁজে বের করা হবে। অন্যদিকে ওপেনএআই বহিরাগত এই পরীক্ষাকে স্বাগত জানালেও দাবি করেছে যে, যে পরিস্থিতিতে পরীক্ষাটি চালানো হয়েছে তা সাধারণ ব্যবহারের পরিবেশকে প্রতিফলিত করে না।
লন্ডনভিত্তিক এই তদারকি সংস্থার প্রতিবেদনটি এমন এক সময়ে সামনে এলো যখন সাম্প্রতিক সময়ে মানুষের নির্দেশনা ছাড়া এআই মডেলগুলোর ক্ষতিকর কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ার একাধিক ঘটনা ঘটছে। গত মাসেও ওপেনএআই প্রকাশ করেছিল যে, তাদের দুটি এআই মডেল পরীক্ষার নির্ধারিত গণ্ডি পেরিয়ে ওপেন-সোর্স প্ল্যাটফর্ম ‘হাগিং ফেস’ হ্যাক করেছিল। এই বিষয়ে সিডনির ইউএনএসডব্লিউ-এর এআই বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক টোবি ওয়ালশ সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে বলেন, এই গবেষণা প্রমাণ করে যে উন্নত এআই মডেলগুলোর মধ্যে অত্যন্ত বিপজ্জনক প্রযুক্তিগত সক্ষমতা রয়েছে।
অধ্যাপক ওয়ালশ আরও সতর্ক করে বলেন যে, বর্তমান বিশ্বে এআই কোম্পানিগুলোর সদিচ্ছা বা সততার ওপর নির্ভর করে থাকা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না, বরং এ বিষয়ে সরকারি কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। তাঁর মতে, উদ্বেগের মূল জায়গাটি হলো এই বিপজ্জনক সাইবার সক্ষমতাগুলো এখন সাধারণ অপরাধী বা হ্যাকারদের হাতের নাগালেও চলে যেতে পারে, যারা আগে নিজেরা এমন জটিল হ্যাকিং করতে সক্ষম ছিল না। ফলে বিশ্বব্যাপী সাইবার হামলার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতিকে চরম ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
