বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক উচ্চাভিলাষী বাজেট বাস্তবায়নে বহুমুখী সংকটের শঙ্কা

বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট উচ্চাভিলাষী আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। চাহিদা সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনীতিতে গতি সঞ্চারের যে কৌশল সরকার গ্রহণ করেছে, তা বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাপক ঝুঁকির সৃষ্টি করতে পারে। প্রস্তাবিত বাজেটে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার বিশাল ঘাটতি পূরণে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মধ্যে ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি আসবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অত্যন্ত দুরূহ, যা শেষ পর্যন্ত সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করবে।
রাজস্ব ঘাটতি বাড়তে থাকলে সরকারকে হয় নতুন মুদ্রা ছাপাতে হবে, নতুবা ব্যয় সংকোচন করতে হবে। মুদ্রা ছাপানো হলে তা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে এবং আর্থিক খাতের সিংহভাগ অর্থ সরকারি কোষাগারে চলে যাওয়ায় বেসরকারি খাত চরম তারল্য সংকটে পড়বে। অর্থনীতির ৮৬ শতাংশ অবদান রাখা বেসরকারি খাত যদি প্রয়োজনীয় অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হয়, তবে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়া অনিবার্য। বাস্তবসম্মত ব্যয় কমিয়ে ভারসাম্য রক্ষার পরিবর্তে সরকার যে উচ্চাভিলাষী চাহিদা বৃদ্ধির পথ বেছে নিয়েছে, তা সংকট নিরসনের চেয়ে সংকট আরও ঘনীভূত করতে পারে।
বাজেট বাস্তবায়নে বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। এর ফলে অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর চাপ বাড়বে, যা ব্যাংক খাতের বর্তমান ভঙ্গুর দশাকে আরও প্রকট করে তুলবে। ইসলামী ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অস্থিরতা আমানত প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করার প্রক্রিয়া দ্রুত বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের মতো শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি আমাদের না থাকায়, এই বিশাল ঘাটতি বাজেট বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হবে।
রাজস্ব খাতের অদক্ষতা ও দুর্নীতিরোধে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আমূল সংস্কার এখন বাধ্যতামূলক। উচ্চ করহার কর ফাঁকির প্রবণতা বাড়ায়, তাই পরোক্ষ কর কমিয়ে প্রত্যক্ষ করের ওপর জোর দেওয়া জরুরি। এর পাশাপাশি ব্যবসায়িক পরিবেশ সহজতর করতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অহেতুক নিয়ন্ত্রণ কমানো প্রয়োজন। সরকারি হস্তক্ষেপ যত কমবে, বেসরকারি খাত তত বেশি গতিশীল হবে। বিদেশ থেকে বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগটি ইতিবাচক হলেও, তা যেন উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহৃত হয় এবং রাউন্ড ট্রিপ বিনিয়োগে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় ফ্যামিলি কার্ডের মতো উদ্যোগগুলো নিম্ন আয়ের মানুষের প্রতি সরকারের সহানুভূতিশীল মনোভাবের প্রতিফলন। এই কর্মসূচিগুলোকে একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডারের আওতায় নিয়ে আসলে এর সুফল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানো সহজ হবে। সব মিলিয়ে প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নের পথে থাকা বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের সুদূরপ্রসারী ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপই এখন মূল ভরসা। আর্থিক ও রাজস্ব খাতের প্রয়োজনীয় সংস্কার ছাড়া এই বিশাল বাজেটের সুফল পাওয়া কঠিন হবে।