যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার লড়াইয়ে চীনের তুরুপের তাস সস্তা জ্বালানি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির বিশ্বব্যাপী আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে এক নতুন স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়েছে। অত্যাধুনিক সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ প্রযুক্তিতে ওয়াশিংটন এগিয়ে থাকলেও, এই প্রযুক্তি সচল রাখার মূল জ্বালানি অর্থাৎ সাশ্রয়ী বিদ্যুতের দিক থেকে বেইজিং দৃশ্যত একচেটিয়া সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এআই মডেলগুলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিশাল ডাটা সেন্টারগুলোর শক্তি জোগাতে চীনের এই অফুরন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ দেশটিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্য অনুযায়ী, এআই মডেল প্রশিক্ষণ ও পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত একটি সাধারণ ডাটা সেন্টার প্রায় ১ লাখ পরিবারের সমান বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারে। আর পরবর্তী প্রজন্মের অতি-বৃহৎ বা ‘হাইপারস্কেল’ ডাটা সেন্টারগুলোর ক্ষেত্রে এই চাহিদা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২০ লাখ পরিবারের সমান বিদ্যুৎ খরচে। এই বিশাল চাহিদার বিপরীতে চীন বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে, যা আগামীতে দেশটির এই খাতের নেতৃত্বকে আরও সুসংহত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান ব্লুমবার্গএনইএফ-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ৫ বছরে চীন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ৬ গুণেরও বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াবে। এই নতুন বিদ্যুৎ সক্ষমতার সিংহভাগই আসবে সৌর ও বায়ু শক্তির মতো নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। কেবল ২০২৫ সালেই চীন ৪৩০ গিগাওয়াটেরও বেশি বায়ু ও সৌর বিদ্যুৎ সক্ষমতা যোগ করেছে, যা ওই বছর বিশ্বজুড়ে যুক্ত হওয়া মোট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সক্ষমতার অর্ধেকেরও বেশি।

এই বিশাল নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে কাজে লাগাতে বেইজিং ‘ইস্ট ডাটা, ওয়েস্ট কম্পিউটিং’ নামক একটি কৌশলগত উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর আওতায় দেশটির পূর্ব উপকূলীয় জনাকীর্ণ অঞ্চলের পরিবর্তে পশ্চিমাঞ্চলের কম বসতিপূর্ণ ও প্রাকৃতিক শক্তিতে সমৃদ্ধ এলাকায় নতুন ডাটা সেন্টারগুলো নির্মাণ করা হচ্ছে। অতি সম্প্রতি চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পরিচালনকারী সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়, দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় নিংজিয়া প্রদেশে সরাসরি ডাটা সেন্টারের সাথে সংযুক্ত ৫০০ মেগাওয়াটের একটি সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্প পুরোদমে সচল করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বর্তমানে ডাটা সেন্টারের সংখ্যার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখনও অনেক এগিয়ে রয়েছে। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির এআই ইনডেক্স অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ডাটা সেন্টারের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫,৪২৭টি, যেখানে চীনে এর সংখ্যা ছিল মাত্র ৪৪৯টি। মার্কিন বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক মরগান স্ট্যানলির প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে সিলিকন ভ্যালির শীর্ষ প্রযুক্তি জায়ান্ট আমাজন, মাইক্রোসফট, মেটা ও অ্যালফাবেট ডাটা সেন্টারসহ এআই অবকাঠামো খাতে ৬৩০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করবে, যা চীনের আলিবাবা বা টেনসেন্টের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর চেয়ে বহুগুণ বেশি।

তবে চীন অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এই ব্যবধান কমিয়ে আনছে। চাইনিজ একাডেমি অব ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশনস টেকনোলজির মতে, ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশটিতে ডাটা সেন্টারের সংখ্যা বার্ষিক ৩০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। রাইস্ট্যাড এনার্জির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে চীনের ডাটা সেন্টারের বিদ্যুৎ ধারণক্ষমতা ৬০ গিগাওয়াটে পৌঁছাবে, যা দেশটির মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২.৩ শতাংশ গ্রাস করবে।

এদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডাটা সেন্টার সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে স্থানীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের সীমাবদ্ধতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জ্বালানি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জি জানিয়েছে, গ্রিডের ত্রুটির কারণে ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন ডাটা সেন্টার প্রকল্পের সংখ্যা ৫০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। উপরন্তু, ‘ডাটা সেন্টার ওয়াচ’-এর তথ্যমতে, স্থানীয় গ্রিডের ওপর অতিরিক্ত চাপের আশঙ্কায় ২০২৪ সালের মে থেকে ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে অন্তত ৩৬টি ডাটা সেন্টার প্রকল্প বন্ধ বা স্থগিত হয়ে গেছে।

ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ লিয়া ফাহি জানিয়েছেন, বেইজিংয়ের কঠোর নিয়ন্ত্রণহীন পরিবেশের কারণে হুয়াওয়ের মতো চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো মাত্র ৬ মাসে একটি মডুলার ডাটা সেন্টার তৈরি করতে পারে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে এর জন্য কমপক্ষে এক বছর সময় লাগে। টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক, এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং এবং ওপেনএআই-এর স্যাম অল্টম্যানের মতো মার্কিন প্রযুক্তি নেতৃত্বও চীনের এই জ্বালানি সক্ষমতাকে অকপটে স্বীকার করেছেন। এক সাক্ষাৎকারে ইলন মাস্ক সতর্ক করে বলেন, এআই সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো বিদ্যুৎ শক্তি এবং চীন বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে তা অবিশ্বাস্য।

আইএমডি বিজনেস স্কুলের ফিউচার রেডিনেস সেন্টারের পরিচালক হাওয়ার্ড ইউ-এর মতে, এই লড়াইয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে চিপ থাকলেও বিদ্যুতের অভাব রয়েছে, আর চীনের বিদ্যুৎ থাকলেও আধুনিক চিপের সংকট রয়েছে। অবশ্য চীনের এই জ্বালানি সুবিধার পেছনেও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অক্সফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক অ্যান্ডার্স হোভের মতে, চীনের বিদ্যুৎ গ্রিডগুলো মূলত প্রাদেশিক স্তরে বিভক্ত হওয়ায় এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা বেশ কঠিন।

পাশাপাশি ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের গবেষক কাইল চ্যান জানিয়েছেন, বিভিন্ন ধরনের হার্ডওয়্যার সমন্বয়ে ডাটা সেন্টার তৈরি করার কারণে চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনেক সময় গুণগত মান ও পরিচালনার ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এছাড়া চীনের ডাটা সেন্টারগুলোর মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ সক্ষমতা ব্যবহৃত হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা তাদের আরেকটি বড় দুর্বলতা।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

0%
0%
0%
0%