ফ্যাক্টচেক
ভারতের কয়েকটি গণমাধ্যম, বিশেষ করে দ্য টেলিগ্রাফ (ইন্ডিয়া) ও নিউজ১৮, সম্প্রতি শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলায় সংঘটিত ব্যবসায়ী খোকন চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ডকে ‘মব হামলা’ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে একজন হিন্দু ব্যবসায়ীকে একটি উচ্ছৃঙ্খল জনতা কুপিয়ে ও আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেছে। এই দাবি বাস্তব ঘটনা ও সরকারি তথ্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।বাংলাদেশ পুলিশ, মামলার এজাহার, র্যাবের গ্রেপ্তার অভিযান এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, এটি কোনোভাবেই মব হামলা বা গণহামলার ঘটনা নয়। বরং এটি ছিল তিনজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির সংঘটিত একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।ঘটনাটি ঘটে ৩১ ডিসেম্বর রাতে। ডামুড্যা উপজেলার কনেশ্বর ইউনিয়নের কেউরভাঙ্গা এলাকায় নিজের দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার পথে খোকন চন্দ্র দাসের ওপর হামলা চালানো হয়। নির্জন স্থানে পথরোধ করে তাকে ছুরি দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তার কাছে থাকা নগদ অর্থ ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পরে হামলাকারীরা পরিচয় শনাক্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তার শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়ে পালিয়ে যায়।
স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এবং পরে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন। অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকায় জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার তার মৃত্যু হয়। চিকিৎসকদের তথ্যমতে, তার শরীরের প্রায় ৩০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল।নিহতের বাবা পরেশ চন্দ্র দাস এ ঘটনায় ডামুড্যা থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় তিনজনকে আসামি করা হয় এবং তাদের নাম ও পরিচয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়। পরবর্তীতে র্যাব অভিযান চালিয়ে কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুর এলাকা থেকে এই তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। অভিযানের নেতৃত্ব দেন র্যাব-১৪, সিপিসি-২ কিশোরগঞ্জ ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার এএসপি শাহজাহান। প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর ও র্যাবের পক্ষ থেকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে।শরীয়তপুরের পুলিশ সুপার রওনক জাহান জানিয়েছেন, নিহত খোকন চন্দ্র দাস মৃত্যুর আগে হামলাকারীদের নাম বলে গেছেন। তিনি আরও জানান, গ্রেপ্তারকৃতরা স্থানীয়ভাবে বখাটে হিসেবে পরিচিত এবং তাদের বিরুদ্ধে মাদক সেবনের অভিযোগ রয়েছে। পুলিশের এই বক্তব্যেও কোথাও গণহামলা বা মব সহিংসতার উল্লেখ নেই।
এই সব তথ্য একত্রে বিশ্লেষণ করলে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় যে, ঘটনাটি একটি সুনির্দিষ্ট অপরাধীচক্রের সংঘটিত পরিকল্পিত হত্যা। এখানে কোনো জনতার উত্তেজনা, হঠাৎ জড়ো হওয়া মানুষ বা গণপিটুনির কোনো উপাদান নেই। তবু ভারতের কিছু গণমাধ্যম নিহতের ধর্মীয় পরিচয় জোরালোভাবে তুলে ধরে ঘটনাটিকে মব হামলা হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা তথ্যগতভাবে ভুল এবং বিভ্রান্তিকর।
এই ধরনের উপস্থাপনা একটি অপরাধমূলক ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক রঙ দেওয়ার চেষ্টা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুযায়ী, যাচাই ছাড়া এমন শব্দ ব্যবহার শুধু ভুল তথ্যই নয়, বরং দুই দেশের মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও ভুল ধারণা তৈরি করে।
সবশেষে বলা যায়, শরীয়তপুরের খোকন চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ড কোনো মব সহিংসতার ঘটনা নয়। এটি ছিল তিনজন চিহ্নিত ব্যক্তির সংঘটিত একটি নৃশংস ও পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। ভারতীয় কয়েকটি গণমাধ্যমের ‘মব হামলা’ দাবি বাস্তব তথ্যের আলোকে ভিত্তিহীন ও মিসলিডিং।