পর্দায় হাসি ছড়ানো রাজপাল যাদবের জীবনে সংকটের কালো ছায়া ও সম্পত্তি নিলামের মুখে অভিনেতা

বলিউডের রূপালি পর্দায় যাঁকে দেখলেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়েন দর্শকেরা, সেই রাজপাল যাদব যেন তিন দশকের ক্যারিয়ারে এক অনন্য হাস্যরসের কারিগর। তাঁর নিখুঁত টাইমিং, মুখের অদ্ভুত ভঙ্গি কিংবা অসহায় পরিস্থিতির হাস্যকর অভিনয়—সব মিলিয়ে তিনি কোটি ভক্তের হৃদয়ে নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করেছেন। অথচ পর্দার এই হাসিখুশি মানুষটির বাস্তব জীবনের আখ্যান যেন এক গভীর ট্র্যাজেডির দলিল। ক্যারিয়ারের শিখরে পৌঁছানোর আগে থেকেই জীবন তাঁর পরীক্ষা নিয়েছে বারবার। একদিকে সেলুলয়েডের আলো ঝলমলে জগত, অন্যদিকে বাস্তব জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত, আইনি মারপ্যাঁচ আর ঋণের বোঝা—রাজপাল যাদবের জীবন যেন দুই বিপরীত মেরুর এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ।
১৯৭১ সালে উত্তর প্রদেশের শাহজাহানপুরে জন্ম নেওয়া এই অভিনেতা দিল্লির ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা থেকে অভিনয়ের হাতেখড়ি নিয়েছিলেন। রাম গোপাল ভার্মার সিনেমায় খলনায়ক হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও, অচিরেই তিনি নিজের জাত চিনিয়েছিলেন কমেডি চরিত্রে। ‘মুঝসে শাদি করোগি’, ‘ফির হেরা ফেরি’ কিংবা ‘ভুল ভুলাইয়া’-এর মতো চলচ্চিত্রে ছোট চরিত্রে অভিনয় করেও তিনি বড় তারকাদের মাঝে নিজের দ্যুতি ছড়িয়েছেন। কিন্তু এই সাফল্যের অনেক আগেই এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি। মাত্র ২০ বছর বয়সে সন্তান প্রসবের সময় স্ত্রীকে হারানোর শোক ছিল তাঁর জীবনের প্রথম বড় আঘাত। সেই দিনটির কথা স্মরণ করে এখনো শিউরে ওঠেন অভিনেতা; জীবনসঙ্গিনীকে দেখার অপেক্ষায় থাকা মানুষটি শেষ পর্যন্ত কাধে তুলে নিয়েছিলেন তাঁর মরদেহ।
ব্যক্তিজীবনের সেই অপূরণীয় ক্ষতির পর রাধা যাদবের হাত ধরে নতুন করে জীবন গুছিয়ে নিয়েছিলেন রাজপাল। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে নিজের পরিচালিত সিনেমা ‘আতা পাতা লাপাতা’র নির্মাণের স্বপ্নই যেন তাঁর গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। ২০১২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই ছবির জন্য নেওয়া ঋণের বোঝা ১৬ বছর পরও পিছু ছাড়েনি তাঁর। দফায় দফায় চেক বাউন্স মামলা, আদালতের বারান্দায় ঘোরাঘুরি এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ব্যর্থতার দায়ে তাঁকে একাধিকবার তিহার কারাগারের চার দেয়ালে বন্দি থাকতে হয়েছে। আদালত তাঁর প্রতিবারের প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করার বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখে কঠোর পর্যবেক্ষণও দিয়েছে।
সবশেষ খবর অনুযায়ী, পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। সেন্ট্রাল ব্যাংক অব ইন্ডিয়া রাজপাল যাদবের পৈতৃক সম্পত্তি নিলামে তোলার প্রক্রিয়া শুরু করেছে, যার নোটিশ ইতোমধ্যে শাহজাহানপুরের বাড়িতে পৌঁছেছে। আগামী ৯ সেপ্টেম্বর নির্ধারিত এই নিলাম যেন তাঁর জীবনের এক দীর্ঘ দুঃস্বপ্নের চূড়ান্ত পরিণতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোটি কোটি রুপির ঋণের বোঝা, আইনি লড়াই আর সম্পত্তি হারানোর শঙ্কার মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন একসময়ের হাসির জাদুকর। পর্দার রাজপাল যাদব হয়তো বিপদে পড়লে দর্শক হাসেন, কিন্তু বাস্তবের রাজপাল আজ এমন এক গোলকধাঁধায় বন্দি, যেখানে হাসির চেয়ে কান্নার সুরই যেন বেশি প্রকট।
