সেউতা ও মেলিয়া নিয়ে স্পেন-মরক্কো কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও অভিবাসন সংকট

উত্তর আফ্রিকার উপকূলে অবস্থিত স্পেনের দুটি স্বায়ত্তশাসিত শহর সেউতা ও মেলিয়াকে কেন্দ্র করে স্পেন ও মরক্কোর মধ্যকার কূটনৈতিক সংকট নতুন করে ঘনীভূত হয়েছে। গত ৩১ জুলাই মরক্কোর সীমান্ত অতিক্রম করে হাজার হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশী স্পেনের সেউতা শহরে প্রবেশ করলে এই অঞ্চলটি আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে। ভৌগোলিকভাবে আফ্রিকা মহাদেশে অবস্থিত এবং মরক্কো দ্বারা পরিবেষ্টিত হলেও, শহর দুটি স্পেনের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃত। এরাই ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র স্থল সীমান্ত যা সরাসরি আফ্রিকার সাথে সংযুক্ত।
অভিবাসনপ্রত্যাশীদের এই সাম্প্রতিক অনুপ্রবেশ সীমান্ত নিরাপত্তা ও অনিয়মিত অভিবাসনের ঝুঁকিকে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সেউতা ও মেলিয়াকে ঘিরে সৃষ্ট এই সংকট মূলত তিনটি বিষয়ের সংমিশ্রণ—অভিবাসনচাপ, শহর দুটির আইনি মর্যাদা এবং মরক্কোর দীর্ঘদিনের সার্বভৌমত্বের দাবি। ইউরোপের অন্যতম স্পর্শকাতর এই অভিবাসন রুটে যখনই উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়, তখন এই শহরগুলো ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কেন্দ্রে পরিণত হয়। স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক একটি রায়ও অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মাঝে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে, যেখানে সমুদ্রপথে আসা ব্যক্তিদের তাৎক্ষণিক ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় কিছু আইনি সীমাবদ্ধতার কথা বলা হয়েছে।
স্পেন ও মরক্কোর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অভিবাসন ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাদ্রিদ অভিবাসন রুট নিয়ন্ত্রণে রাবাতের সহযোগিতার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তবে অতীতে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের জের ধরে এই সীমান্ত পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে দেখা গেছে। ২০২১ সালে যখন স্পেন পশ্চিম সাহারা অঞ্চলের স্বাধীনতা আন্দোলনকারী গোষ্ঠী পলিসারিও ফ্রন্টের নেতা ইব্রাহিম গালিকে চিকিৎসার জন্য স্পেনে আশ্রয় দেয়, তখন মরক্কো সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে দেয়, যার ফলে হাজার হাজার অভিবাসী সেউতায় প্রবেশ করে। ওই ঘটনা স্পষ্ট করে দেয় যে, অভিবাসন ইস্যুটি কীভাবে দুই দেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক বিরোধের সাথে মিশে যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোয় সেউতা ও মেলিয়া স্পেনের সার্বভৌম ভূখণ্ড হিসেবে স্বীকৃত। জাতিসংঘের অ-স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চলের তালিকায় শহর দুটির নাম নেই, যার ফলে এটি কোনো ঔপনিবেশিক বিমোচন প্রক্রিয়ার আওতাভুক্ত নয়। স্পেন সবসময়ই দাবি করে আসছে যে, শহর দুটি তাদের মূল ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং এর সার্বভৌমত্ব নিয়ে আলোচনার কোনো সুযোগ নেই। অন্যদিকে, মরক্কো ঐতিহাসিকভাবে আফ্রিকান মহাদেশে ইউরোপীয় উপস্থিতিকে একটি পুরনো ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার হিসেবে গণ্য করে এবং শহরগুলোর ওপর নিজেদের অধিকারের দাবি বজায় রেখেছে।
ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে স্পেন ও মরক্কোর ইতিহাস অত্যন্ত গভীর ও প্রাচীন। ১৪১৫ সালে পর্তুগাল সেউতা দখল করে এবং ১৬৪০ সালের পর তা স্পেনের অধীনে চলে আসে। মেলিয়া ১৪৯৭ সাল থেকে স্পেনের শাসনাধীন রয়েছে। এই দীর্ঘ ইতিহাস এবং বর্তমান সাংবিধানিক সংহতিকে স্পেন তাদের অধিকারের ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করে। মরক্কো সেই একই ইতিহাসকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে, যা আজও দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কের সমীকরণে প্রভাব ফেলে।
বর্তমানে কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিক আলোচনার মাধ্যমে সার্বভৌমত্ব পরিবর্তনের উদ্যোগ নিচ্ছে না। এর পরিবর্তে, বিদ্যমান সংকটগুলো কূটনৈতিক অস্থিরতা ও অভিবাসনজনিত চাপের সময়ে পরোক্ষভাবে প্রতিফলিত হয়। সেউতা ও মেলিয়ার মতো শহরগুলো ভৌগোলিকভাবে আফ্রিকায় অবস্থিত হলেও রাজনৈতিকভাবে ইউরোপের অংশ, যা এদেরকে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে সংবেদনশীল সীমান্ত হিসেবে চিহ্নিত করে রেখেছে। যতদিন এই অঞ্চলে অভিবাসন চাপ ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে ভিন্নমত অব্যাহত থাকবে, ততদিন এই শহরগুলো ভূ-রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
