লুইজ লন্ডন স্মরণে

মানবাধিকারের প্রতি অবিচল অঙ্গীকারবদ্ধ আইনজীবী, ইতিহাসবিদ এবং আশ্রয়প্রার্থীদের সেবায় নিবেদিতপ্রাণ স্বেচ্ছাসেবক লুইজ লন্ডন ৭৮ বছর বয়সে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। সারাজীবন তিনি সুবিধা বঞ্চিতদের পক্ষে কাজ করেছেন, শরণার্থী এবং আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য আইনি লড়াই চালিয়েছেন।
ব্রিটিশ সরকারের শরণার্থী সংকট, হলোকাস্ট ও তার পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার ওপর প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে ইতিহাসবিদ টনি কুশনারের মতে তাঁর ২০০০ সালে প্রকাশিত ‘হোয়াইটহল অ্যান্ড দ্য জিউস, ১৯৩৩-১৯৪৮’ আজও সমাদৃত।
লুইজের বাবা-মা ছিলেন ইহুদি শরণার্থী, যাঁরা ১৯৩০-এর দশকে নাৎসিবাদ থেকে পালিয়ে যুক্তরাজ্যে এসে পরস্পরের সাথে পরিচিত হন এবং আইল অফ ম্যানে কারারুদ্ধ ছিলেন। তাঁর বাবা, বন শহরের পদার্থবিজ্ঞানী হেইঞ্জ লন্ডন পরে হারওয়েলের অ্যাটমিক এনার্জি রিসার্চ এস্টাবলিশমেন্টে যোগ দেন এবং মা লুসি (মেইসনার), ভিয়েনার একজন পিয়ানো শিক্ষক, অক্সফোর্ডে বসবাস শুরু করেন। এখানেই লুইজ এবং তাঁর তিন ছোট ভাইবোন, নোরাহ, মার্টিন ও ফ্রেড জন্মগ্রহণ করেন।
অক্সফোর্ড হাই স্কুলে লেখাপড়া শেষে লুইজ কেমব্রিজের নিউনহ্যাম কলেজে ইংরেজি নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং ১৯৭০ সালে স্নাতক হন। আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করার পর তিনি ক্যামডেন ও হ্যাকনি আইন কেন্দ্রে কাজ শুরু করেন। মূলত তিনি কাউন্সিল হাউজিংয়ের বাসিন্দাদের সাহায্য করতেন এবং উচ্ছেদ মামলায়, যার মধ্যে ১৯৭৮ সালের হান্টলি স্ট্রিটের দখলদারদের মামলাও ছিল, আইনি সহায়তা প্রদান করতেন।
এরপর তিনি একটি লিগ্যাল এইড ফার্মে যোগ দিয়ে অভিবাসন আইনে দক্ষতা অর্জন করেন এবং শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধ থেকে আগত তামিল শরণার্থীদের মতো বহু মানুষের সাথে কাজ করেন। শরণার্থীদের মুখোমুখি হওয়া সরকারি বিধিনিষেধ নিয়ে এই অভিজ্ঞতা লুইজের ২০শ শতাব্দীর ব্রিটিশ অভিবাসন নীতি সম্পর্কে আগ্রহ বাড়িয়ে তোলে এবং এর ফলস্বরূপ তিনি ১৯৯২ সালে কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডনে পিএইচডি সম্পন্ন করেন।
তাঁর গবেষণাপত্রটি আর্নস্ট ফ্রাঙ্কেল পুরস্কার লাভ করে, যা পরে ‘হোয়াইটহল অ্যান্ড দ্য জিউস’ বইয়ে রূপান্তরিত হয়। এই সময়কালে তিনি অক্সফোর্ড সেন্টার ফর পোস্টগ্র্যাজুয়েট হিব্রু অ্যান্ড জিউয়িশ স্টাডিজ, ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন এবং রয়্যাল হলোওয়ে, ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডনে শিক্ষকতাও করেন।
২০০০ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত লুইজ বিচার মন্ত্রণালয়ে ক্রিমিনাল আপিল অফিসের একজন কেসওয়ার্ক আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তিনি ইতিহাসবিদ হিসেবে তাঁর কাজে মনোনিবেশ করতে পদত্যাগ করেন এবং হলোকাস্ট-পরবর্তী শরণার্থী নীতি নিয়ে অসংখ্য নিবন্ধ প্রকাশ করেন।
এই সময়ে তিনি জ্যাকিয়াস ২০০০ ট্রাস্টের জন্য একজন স্বেচ্ছাসেবী আইনজীবী হিসেবেও কাজ করেন। ২০১৭ সালে তিনি বার্কবেক ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অফ অ্যান্টিসেমিটিজম-এ একজন সম্মানিত গবেষণা ফেলো হিসেবে নিযুক্ত হন।
১৯৯২ সালে লুইজ অ্যান্ড্রু ম্যাকডোনাল্ডকে বিয়ে করেন, যিনি তখন পাবলিক রেকর্ডস অফিসের সরকারি পরিষেবা বিভাগের প্রধান ছিলেন। তাঁরা চীন থেকে জু নামের একটি সন্তান দত্তক নেন। ২০১৭ সালে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হলেও তাঁরা বন্ধু হিসেবেই ছিলেন এবং ২০২১ সালে অ্যান্ড্রুর মৃত্যুর আগে লুইজ তাঁর দেখাশোনায় সহযোগিতা করেন।
অত্যন্ত অনুগত, উদার, বিনয়ী এবং চমৎকার হাস্যরসের অধিকারী লুইজ তাঁর সমস্ত কাজ আবেগ ও সততার সাথে সম্পন্ন করতেন। তাঁর কাজ, বন্ধুত্ব এবং শিল্পকলায় তাঁর সম্পৃক্ততায় এর প্রমাণ মিলেছে – তিনি বার্টস গায়কদের একজন সদস্য ছিলেন এবং একজন গ্রাফিক শিল্পী হিসেবে রয়্যাল একাডেমির গ্রীষ্মকালীন প্রদর্শনীতে তাঁর কাজ নির্বাচিত হয়েছিল।
মৃত্যুকালে তিনি তাঁর সন্তান জু এবং ভাইবোনদের রেখে গেছেন।
তথ্যসূত্র: দ্যা গার্ডিয়ান
