পাকিস্তান কি ইরান-মার্কিন পরমাণু সমঝোতাকে নিরাপদ করতে পারবে, যেমন ট্রাম্প বলেছেন চুক্তি 'ঘনিষ্ঠ'?

ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা ও আলোচনার মধ্যে আশাবাদী সুর তুলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র, এমনকি সেই চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য তিনি ইসলামাবাদ সফরও করতে পারেন।

বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র না তৈরির বিষয়ে প্রায় সব শর্তে সম্মত হয়েছে। তিনি দাবি করেন, ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ হস্তান্তর করতেও রাজি হয়েছে, যা ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত হতে পারত।

তবে ইরানের পক্ষ থেকে এই দাবির ভিন্ন চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমায়েল বাঘাই জানিয়েছেন, পাকিস্তানের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান হলেও ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি, বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, বন্ধ করবে না। তাদের অবস্থান অনুযায়ী, শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকার একটি সার্বভৌম অধিকার।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দুই পক্ষের বক্তব্যে যে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে, তা আসলে চলমান জটিল ও বহুস্তরীয় আলোচনার প্রতিফলন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক সৈয়দ মোজতবা জালালজাদেহ মনে করেন, “এটি কোনো সরল দ্বন্দ্ব নয়, বরং আলোচনার কৌশলগত অবস্থান প্রকাশ করছে।”

এদিকে কূটনৈতিক তৎপরতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে পাকিস্তান। দেশটির সেনাপ্রধান আসিম মুনির বর্তমানে তেহরানে অবস্থান করছেন এবং সেখানে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করছেন। তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।

অন্যদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ সফর করছেন এবং আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক চালিয়ে যাচ্ছেন। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষায় পাকিস্তান একটি কার্যকর মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে।

হোয়াইট হাউসও পাকিস্তানের এই ভূমিকাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন, ভবিষ্যতের সরাসরি আলোচনা ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হতে পারে।

তবে সাবেক পাকিস্তানি কূটনীতিক আসিফ দুররানি সতর্ক করে বলেছেন, “পাকিস্তান কেবল আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।”

বর্তমানে ২২ এপ্রিল নির্ধারিত যুদ্ধবিরতির সময়সীমাকে সামনে রেখে কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার হয়েছে। ইসলামাবাদে সম্ভাব্য উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও ট্রাম্পের সফরের গুঞ্জনের মধ্যে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও বাড়ানো হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শেষ পর্যন্ত যে কোনো চুক্তি হতে পারে ‘ইচ্ছাকৃত অস্পষ্টতা’র ওপর ভিত্তি করে, যাতে উভয় পক্ষই নিজেদের জনগণের কাছে এটিকে ‘জয়’ হিসেবে তুলে ধরতে পারে।

এদিকে আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নেতৃত্বাধীন ইসরায়েল-লেবানন উত্তেজনাও এই আলোচনায় প্রভাব ফেলছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ১০ দিনের একটি যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছে, যা বৃহত্তর সমঝোতার পথ তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়াকে ঘিরে এই বহুমাত্রিক কূটনৈতিক তৎপরতা এখন এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে ইসলামাবাদ হতে পারে একটি সম্ভাব্য ঐতিহাসিক চুক্তির কেন্দ্রস্থল।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

০%
০%
০%
০%