যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে দূষিত সামরিক ঘাঁটিতে শিশুদের জন্য আইসিই আটককেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের অধীনে অভিবাসন ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট বা আইসিই যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি পিএফএএস দূষিত স্থানগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত লুইসিয়ানার সাবেক সামরিক ঘাঁটিতে শিশু ও তাদের পরিবারের জন্য একটি আটক সুবিধা তৈরির পরিকল্পনা করছে। একই সঙ্গে এই স্থাপনাটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্বাসন কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে বলে জানা গেছে।
লুইসিয়ানার সাবেক ইংল্যান্ড এয়ার ফোর্স বেস, যা বর্তমানে ইংল্যান্ড এয়ারপার্ক নামে পরিচিত, একটি বিশাল সাবেক সামরিক স্থাপনা। সেখানে ভূগর্ভস্থ পানিতে পিএফএএসের মাত্রা প্রতি ট্রিলিয়নে অন্তত ৪১ কোটি অংশ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। বিভিন্ন পিএফএএস যৌগের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল পানীয় জলের সীমা ৪ থেকে ১০ অংশ প্রতি ট্রিলিয়নের মধ্যে। অর্থাৎ ইংল্যান্ড এয়ারপার্কে পাওয়া দূষণের মাত্রা নির্ধারিত সীমার চেয়ে সর্বোচ্চ প্রায় ৫৭ লাখ ৫০ হাজার গুণ বেশি।
সামরিক ঘাঁটিগুলোতে পিএফএএস দূষণ অস্বাভাবিক নয়। তবে ইংল্যান্ড এয়ারপার্কে পাওয়া দূষণের মাত্রা এখন পর্যন্ত নথিভুক্ত সর্বোচ্চ মাত্রাগুলোর মধ্যে অন্যতম। এ কারণে স্থানটিকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে পিএফএএস-দূষিত এলাকাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
পিএফএএস হলো অন্তত ১৬ হাজার রাসায়নিক যৌগের একটি বিশাল শ্রেণি, যা পানি, দাগ ও তাপ প্রতিরোধী বিভিন্ন পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এগুলো প্রাকৃতিকভাবে সহজে ভেঙে যায় না এবং দীর্ঘ সময় পরিবেশে থেকে যায় বলে পিএফএএসকে ‘চিরস্থায়ী রাসায়নিক’ বলা হয়। বিভিন্ন গবেষণায় এসব রাসায়নিকের সঙ্গে ক্যানসার, কিডনি রোগ, লিভারের সমস্যা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর বিরূপ প্রভাব, জন্মগত ত্রুটি এবং অন্যান্য গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
এনভায়রনমেন্টাল ওয়ার্কিং গ্রুপের জ্যেষ্ঠ নীতি বিশ্লেষক জ্যারেড হেইস বলেন, দূষিত একটি সামরিক ঘাঁটিতে শিশু ও তাদের পরিবারকে রাখা হলে স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, “দূষিত ঘাঁটিতে আবাসন থাকা উচিত নয়। আর যদি আমরা মানুষকে ক্ষতির পথে ফেলতে যাচ্ছি, তাহলে এই দূষণ দ্রুত পরিষ্কার করা দরকার।”
ইংল্যান্ড এয়ারপার্কে পিএফএএস ছাড়াও ট্রাইক্লোরোইথিলিন বা টিসিই এবং বিভিন্ন ধরনের উদ্বায়ী জৈব যৌগের দূষণ রয়েছে। সাবেক সামরিক ব্যারাকগুলোতে অ্যাসবেস্টসের উপস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। যদিও প্রস্তাবিত আটককেন্দ্রে সম্ভবত অন্য স্থান থেকে পানীয় জল সরবরাহ করা হবে, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, মাটি ও বাতাসে থাকা বিষাক্ত রাসায়নিকও মানুষের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
পিএফএএস মূলত সামরিক ঘাঁটি ও বিমানবন্দরে ব্যবহৃত অগ্নিনির্বাপক ফোমের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে বলে ধারণা করা হয়। ইংল্যান্ড এয়ারপার্কের আশপাশে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সময় এই ধরনের ফোম ব্যবহার করা হয়েছিল। পরে রাসায়নিকগুলো মাটির ভেতর দিয়ে ভূগর্ভস্থ পানিতে পৌঁছায়।
সাবেক এই সামরিক ঘাঁটিতে অস্ত্র, আবর্জনা, মানববর্জ্য, বিষাক্ত বর্জ্য, প্লাস্টিক এবং বিভিন্ন রাসায়নিক পোড়ানোর জন্য বার্ন পিটও ব্যবহার করা হতো। এসব গর্তে জেট জ্বালানি ত্বরক হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ফলে পিএফএএসসহ বিভিন্ন বিষাক্ত পদার্থ মাটি ও আশপাশের পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
পিএফএএস অত্যন্ত চলনশীল ও উদ্বায়ী রাসায়নিক হওয়ায় এগুলো মাটি, পানি ও বাতাসের মাধ্যমে পরিবেশের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। শিশুদের শরীরের আকার ছোট হওয়ায় একই পরিমাণ রাসায়নিকের সংস্পর্শে তাদের শরীরে তুলনামূলকভাবে বেশি প্রভাব পড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
হেইস বলেন, “সাইটে বসবাসকারী মানুষের জন্য ঝুঁকি ধুলো ও বাতাসে থাকতে পারে। আমরা জানি না ধুলায় রাসায়নিকের মাত্রা কত, কিংবা শিশুরা বাইরে খেললে তাদের কী ধরনের ঝুঁকি হতে পারে। এগুলো উদ্বেগের বিষয়।”
তার দাবি, সামরিক কর্তৃপক্ষ এখনো সাইটে মাটি ও বাতাসের যথেষ্ট পরীক্ষা করছে না।
আইসিই একটি স্বল্পমেয়াদি আটক সুবিধা তৈরির পরিকল্পনা করছে, যাকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ ধরনের প্রথম উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সেখানে অভিবাসী পরিবার ও অভিভাবকহীন শিশুদের রাখা হতে পারে। প্রস্তাবিত কেন্দ্রটি একটি রানওয়ের কাছাকাছি অবস্থিত হবে, যেখান থেকে তাদের যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হতে পারে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, সাবেক সামরিক ব্যারাক সংস্কার করে তৈরি করা এই কেন্দ্রে পরিবার ও শিশুদের তিন থেকে পাঁচ দিনের জন্য রাখা হবে। প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, সেখানে মূলত এমন অভিবাসীদের রাখা হবে যারা স্বেচ্ছায় ‘স্ব-নির্বাসন’ বেছে নেবেন।
তবে অভিবাসী অধিকারকর্মীরা এই দাবির বিরোধিতা করেছেন। তাদের মতে, ‘স্ব-নির্বাসন’ শব্দটি বিভ্রান্তিকর এবং বাস্তবে অনেক অভিবাসী বাধ্যতামূলকভাবে এই কর্মসূচির আওতায় পড়তে পারেন। তাদের আশঙ্কা, আটক ব্যক্তিরা পাঁচ দিনের চেয়েও বেশি সময় ওই কেন্দ্রে থাকতে পারেন।
ইংল্যান্ড এয়ারপার্কের বৃহত্তর কমপ্লেক্সে ইতোমধ্যে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালিত আটককেন্দ্র রয়েছে। অতীতে ওই কেন্দ্রের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত হয়েছে।
মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ এক বিবৃতিতে বলেছে, “এই মুহূর্তে ঘোষণা করার মতো নতুন কোনো আটককেন্দ্র আমাদের নেই।”
তবে প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এর আগে জানিয়েছিলেন, সাইটটির ইজারা চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া চলছে এবং ৬০ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে এটি চালু হতে পারে। মার্কিন পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা এবং আইসিই এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
অভিবাসন আটককেন্দ্রবিষয়ক সংগঠন লুইসিয়ানা অ্যাডভোকেটস ফর ইমিগ্র্যান্টস ইন ডিটেনশনের ফ্রান্সেস কেলি বলেন, কাছের আলেকজান্দ্রিয়া শহর থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে ওই স্থানে পানি সরবরাহ করা হতে পারে। তবে আলেকজান্দ্রিয়া শহরও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে দূষিত ভূগর্ভস্থ পানির বিস্তৃতি কতদূর পর্যন্ত, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
কাছের পাইনভিল এলাকায় তিন ধরনের পিএফএএস যৌগের উচ্চ মাত্রা পাওয়া গেছে। যদিও সেগুলো ইংল্যান্ড এয়ারপার্কে প্রধানত পাওয়া যৌগগুলোর সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।
কেলি বলেন, নথিপত্র অনুযায়ী ওই জমি শিল্প ব্যবহারের জন্য সীমাবদ্ধ। তাই সেখানে মানুষকে আবাসিকভাবে রাখার পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তার মতে, শিল্প ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত জমিকে আবাসনের উপযোগী করতে আরও কঠোর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মানদণ্ড প্রয়োজন হতে পারে।
এয়ারপার্ক কর্তৃপক্ষের একজন মুখপাত্র দাবি করেছেন, ব্যারাক এলাকায় পিএফএএস দূষণ নেই। তবে ওই কর্তৃপক্ষ মাটি ও বাতাস পরীক্ষা করেছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত প্রশ্নের তাৎক্ষণিক উত্তর পাওয়া যায়নি।
হেইসের মতে, ফেডারেল রেকর্ডে এখনো পিএফএএস দূষণ পরিষ্কারের মূল নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার কোনো প্রমাণ নেই। সামরিক কর্তৃপক্ষ এখনো মূলত দূষণের বিস্তার পরীক্ষা এবং ভূগর্ভস্থ পানির দূষিত অংশের মানচিত্র তৈরির পর্যায়ে রয়েছে।
তিনি বলেন, “মনে হচ্ছে তারা এখনো পরিষ্কারের নির্মাণকাজ শুরু করেনি। তারা পরীক্ষা ও মানচিত্র তৈরির কাজ করছে। এর অর্থ হলো দূষিত অংশটি সাইটের ভেতরে আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে।”
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভূগর্ভস্থ পানিতে পিএফএএসের মাত্রা কিছুটা কমেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এর অর্থ এই নয় যে দূষণ দূর হয়েছে। তাদের ব্যাখ্যা, সামরিক কর্তৃপক্ষ যদি সক্রিয়ভাবে দূষিত ভূগর্ভস্থ পানির অংশ অপসারণ না করে, তাহলে রাসায়নিকগুলো আরও বিস্তৃত জলাধারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে উৎসস্থলে রাসায়নিকের ঘনত্ব কমলেও সামগ্রিক দূষণ আরও বড় এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
এদিকে, অভিবাসন অধিকারকর্মীরা পরিকল্পনাটি ঠেকানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের আশঙ্কা, বিষাক্ত রাসায়নিক দূষণে আক্রান্ত একটি সাবেক সামরিক ঘাঁটিতে শিশু ও তাদের পরিবারকে আটক রাখা হলে তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে।
ফ্রান্সেস কেলি বলেন, “এটি পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনার সবসময়ই একটি উপায় থাকে।”
তবে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতি, শিশু আটক এবং পরিবেশগত নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হতে পারে।
তথ্যসূত্র: দ্যা গার্ডিয়ান