রাশিয়ার গভীরে ইউক্রেনের দূরপাল্লার ড্রোন হামলার তীব্রতা ও কৌশলগত পরিবর্তনের চিত্র

পূর্ব ইউক্রেনের এক নির্জন খামারের মাঠ থেকে গভীর রাতে আকাশচুম্বী গর্জন তুলে যাত্রা শুরু করে দূরপাল্লার ড্রোন। আল জাজিরার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ইউক্রেনের কাইরোস ব্যাটালিয়নের গোপন অভিযানের চিত্র, যেখানে নিখুঁত সমন্বয়ের মাধ্যমে রাশিয়ার অভ্যন্তরে আঘাত হানার প্রস্তুতি চলছে। প্রায় ৬ মিটার ডানাযুক্ত এই ড্রোনগুলো ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটার গতিতে কয়েক হাজার মিটার উঁচুতে উঠে রাশিয়ার আকাশসীমায় প্রবেশ করে। এই ড্রোনগুলো পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কর্নেল রে বলেন, একটি অর্কেস্ট্রার মতো নিখুঁত সমন্বয়ই তাদের অভিযানের মূল চাবিকাঠি।
বর্তমানে ইউক্রেন নিজস্ব প্রযুক্তিতে শত শত আত্মঘাতী ড্রোন তৈরি করছে, যা পশ্চিমা মিত্রদের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে তাদের রাশিয়ার ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার গভীরে আঘাত হানার সক্ষমতা দিয়েছে। মস্কো, সেন্ট পিটার্সবার্গসহ সাইবেরিয়ার বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল ও তেল শোধনাগার এখন কিয়েভের ড্রোনের প্রধান লক্ষ্যবস্তু। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের ভাষায়, এটি অনেকটা ‘দূরপাল্লার নিষেধাজ্ঞা’র মতো, যার মাধ্যমে অর্থনৈতিক চাপের মুখে থাকা রাশিয়ার যুদ্ধের অর্থ জোগান ব্যাহত করার চেষ্টা চলছে।
তেল ও গ্যাস অবকাঠামোর বাইরেও ইউক্রেন এখন রাশিয়ার বৃহত্তম অনলাইন বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ‘ওয়াইল্ডবেরিস’-এর মতো লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণ চালাচ্ছে। ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা মিখাইলো পোডোলিয়াক জানিয়েছেন, এই হামলার উদ্দেশ্য হলো রাশিয়ার প্রতিরক্ষা খাতের ব্যবসায়িক ক্ষতি করা, তাদের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করা এবং যুদ্ধের বাস্তবতা অনুধাবন করানো। কিয়েভের দাবি, এই প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহার করে রাশিয়া সামরিক সরঞ্জাম ও ড্রোনের খুচরা যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করে থাকে, যা ইউক্রেনের সাধারণ মানুষ ও সেনাদের মৃত্যুর কারণ হচ্ছে।
মাঠ পর্যায়ে অভিযান শেষ হওয়ার পরপরই সেনাসদস্যরা দ্রুত তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেন। মাত্র পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে ছয়টি ড্রোন আকাশে পাঠানোর পর রুশ গোয়েন্দা ড্রোনের নজর এড়াতে গোপন আস্তানার দিকে রওনা হন তারা। কর্নেল রে জানান, এটি কেবল কয়েক শ ড্রোনের একটি ক্ষুদ্র অংশমাত্র, যা নিয়মিত বিরতিতে রাশিয়ার অভ্যন্তরে আঘাত হেনে চলেছে। যুদ্ধের এই দীর্ঘ লড়াইকে একটি বক্সিং ম্যাচের সাথে তুলনা করে তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত ধৈর্য এবং নৈতিক মনোবলই যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণ করবে।
ইউক্রেনীয় সেনাদের দাবি, রাশিয়ার বাহিনীর সাথে তাদের মূল পার্থক্য হলো উদ্দেশ্য ও আত্মবিশ্বাসের জায়গায়। কর্নেল রের মতে, রুশ সেনারা কেন যুদ্ধ করছে তা সম্ভবত তারা নিজেরাও জানে না, কিন্তু ইউক্রেনীয় যোদ্ধারা তাদের মাতৃভূমি ও জনগণকে রক্ষার সুস্পষ্ট লক্ষ্য নিয়ে অটল রয়েছেন। রাতের অন্ধকারে ভেসে যাওয়া ড্রোনগুলো রাশিয়ার অভ্যন্তরে যুদ্ধের উত্তাপ ছড়িয়ে দিয়ে প্রমাণ করছে যে, সংঘাত এখন আর কেবল সম্মুখ সমরে সীমাবদ্ধ নেই।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
