ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তু রাশিয়ার বৃহৎ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ওয়াইল্ডবেরিস

ইউক্রেন যুদ্ধের আঁচ এবার সরাসরি রাশিয়ার সাধারণ জনজীবনে ছড়িয়ে দিতে দেশটির বৃহত্তম অনলাইন খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ‘ওয়াইল্ডবেরিস’-কে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে কিয়েভ। রাশিয়ার আমাজন হিসেবে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন গুদামে নিয়মিত ড্রোন হামলা চালিয়ে ইউক্রেনীয় বাহিনী কার্যত রাশিয়ার অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের অভ্যস্ততায় আঘাত হানছে। আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে দূরে থাকতে চাওয়া রুশ নাগরিকদের দৈনন্দিন কেনাকাটার অন্যতম কেন্দ্র এখন এই হামলার প্রধান শিকার।
গত শুক্রবার রাশিয়ার ইয়েকেতেরিনবুর্গ শহরে অবস্থিত ওয়াইল্ডবেরিসের একটি গুদামে ভয়াবহ ড্রোন হামলা চালায় ইউক্রেনীয় বাহিনী। ইউক্রেন সীমান্ত থেকে প্রায় ২ হাজার ৮৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই স্থাপনায় হামলার পরপরই আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়। যদিও আঞ্চলিক গভর্নর দেনিস পাসলের জানিয়েছেন, ৮০০ কর্মীকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং কেউ হতাহত হয়নি, তবে এই ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে সীমিত করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।
মধ্য জুলাই থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ১২টি গুদাম সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস হয়েছে, যেখানে ১৩ জন কর্মী নিহত এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন। কিয়েভ এই গুদামগুলোকে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে দাবি করেছে যে, প্রতিষ্ঠানটি ড্রোন সরঞ্জাম, নেভিগেশন প্রযুক্তি এবং প্রাথমিক চিকিৎসার কিটসহ সামরিক ও দ্বৈত ব্যবহারের পণ্য সরবরাহের মাধ্যমে যুদ্ধের জ্বালানি জোগাচ্ছে। তবে ক্রেমলিন ও ওয়াইল্ডবেরিস উভয়ই এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
জার্মানির ব্রেমেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নিকোলাই মিত্রোখিন মনে করেন, এই হামলার মূল লক্ষ্য সামরিক নয়, বরং রাশিয়ার অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থায় প্রভাব ফেলা। তিনি বলেন, কিয়েভ এই হামলার মাধ্যমে রাশিয়ার সাধারণ মানুষের কাছে বার্তা দিতে চায় যে, যুদ্ধটি কেবল সীমান্তে সীমাবদ্ধ নেই। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলার ফলে সামরিক সরবরাহে বড় ধরনের কোনো বিঘ্ন ঘটবে না, কারণ বিকল্প উৎস থেকে একই ধরনের পণ্য সংগ্রহ করা সম্ভব।
২০২৫ সালে ওয়াইল্ডবেরিসের ব্যবসায়িক লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৭৯ বিলিয়ন ডলার, যা রাশিয়ার মোট জিডিপির প্রায় ৩ শতাংশ। রাশিয়ার সাধারণ মানুষের কাছে এটি কেবল কেনাকাটার ওয়েবসাইট নয়, বরং একটি সামাজিক যোগাযোগ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির উপদেষ্টা মিখাইলো পোডোলিয়াক স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, যারা যুদ্ধ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখতে চায়, তাদের এই সুবিধাজনক বলয় ভেঙে দেওয়াই তাদের কৌশল।
এদিকে নিয়মিত হামলার ফলে ওয়াইল্ডবেরিসের লজিস্টিক নেটওয়ার্ক সংকটের মুখে পড়েছে। যেহেতু প্রতিষ্ঠানটি ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ক্ষয়ক্ষতির বিপরীতে কোনো বিমা সুবিধা পায় না, তাই ছোট ছোট খুচরা ব্যবসায়ীরাও এখন দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। রুশ সরকার কর ছাড় বা ভর্তুকির মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও, কিয়েভ তাদের এই ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধের’ কৌশল অব্যাহত রাখার প্রত্যয় জানিয়েছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
