যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় শোকের আবহে রমজান, ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিতেও থামেনি দুর্ভোগ

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় পবিত্র রমজান শুরু হয়েছে গভীর শোক, অনিশ্চয়তা ও টিকে থাকার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। মুসলমানদের এই পবিত্র মাসটি যেখানে সাধারণত আনন্দ, পারিবারিক মিলনমেলা ও ইবাদতের আবহে উদযাপিত হয়, সেখানে চলমান যুদ্ধ ও প্রতিদিনের সহিংসতার অভিযোগে এবারের রমজান একেবারেই ভিন্ন বাস্তবতা নিয়ে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

গাজা সিটির বাসিন্দা ফেদা আইয়াদ বলেন, “আমরা আমাদের পরিবার ও স্বজনদের হারিয়েছি—এরপর আর কোনো আনন্দ থাকে না। পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেও হৃদয়ে রমজানের আবহ অনুভব করতে পারছি না। আমি তাদের একজন, যারা রমজানের পরিবেশ অনুভবই করতে পারছি না।”

বুধবার গাজায় রমজান শুরু হয়েছে। সাধারণত এ মাসে মুসলমানরা ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজা রাখেন এবং পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটানো, ইবাদত, আত্মসমালোচনা ও দানশীলতায় মনোনিবেশ করেন। কিন্তু গাজার বাস্তবতা এখন ভিন্ন ও কঠিন।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে এখন পর্যন্ত অন্তত ৭২ হাজার ৬১ জন নিহত এবং ১ লাখ ৭১ হাজার ৭১৫ জন আহত হয়েছেন। ব্যাপক বোমাবর্ষণ ও স্থল অভিযানে অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে, বাস্তুচ্যুত হয়েছেন অধিকাংশ বাসিন্দা।

বিজ্ঞাপন

এ সপ্তাহে বাজারগুলোতে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় ছিল আর্থিক সংকট। গাজা সিটির বাসিন্দা ওয়ালিদ জাকজুক বলেন, “মানুষের হাতে কোনো নগদ অর্থ নেই। কাজ নেই। রমজান এসেছে, কিন্তু রমজান পালনে অর্থের প্রয়োজন।” তিনি ব্যবসায়ীদের মানুষের দুর্দশা বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান।

তিনি আরও বলেন, “যুদ্ধের আগে মানুষ সম্মানজনক জীবন যাপন করত। যুদ্ধের পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। মানুষ ভেঙে পড়েছে, ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।”

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তীব্র শীত ও ভারী বৃষ্টিপাতের দুর্ভোগ। প্রচণ্ড ঠান্ডায় শিশুদের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ভারী বর্ষণে বাস্তুচ্যুতদের অস্থায়ী শিবির প্লাবিত হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলো ধসে পড়েছে।

গাজা সিটির বাসিন্দা রায়েদ কুহেইল বলেন, “যুদ্ধের আগের রমজান আর এবারের রমজানের মধ্যে অনেক পার্থক্য। আগে পরিবেশ ছিল আনন্দময়। রাস্তাঘাট আলোকসজ্জায় ভরে উঠত। শিশুরা খুশি থাকত।”

তবে ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও কিছু ফিলিস্তিনি রমজানের ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। খান ইউনিসে ক্যালিগ্রাফার হানি দাহমান ধ্বংসস্তূপের মাঝে আরবি ভাষায় ‘স্বাগতম, রমজান’ লিখে শিশুদের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করেন।

তিনি বলেন, “আমরা খান ইউনিস ক্যাম্পে শিশু, নারী, পুরুষ ও পুরো পরিবারের হৃদয়ে কিছুটা আনন্দ ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করছি। আমরা বিশ্বকে জানাতে চাই—আমরা এমন একটি জাতি, যারা জীবনের সন্ধান করে।”

ধ্বংসস্তূপের মাঝেই ঝুলছে রঙিন রমজান বাতি। এই দৃশ্য দেখে মোহাম্মদ তানিরি বলেন, “এমন ছোট ও সুন্দর সাজসজ্জা শিশুদের মুখে হাসি আনে। সব কষ্টের মধ্যেও তারা একটি সুন্দর পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করছে।”

যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় এবারের রমজান তাই উৎসবের চেয়ে বেশি হয়ে উঠেছে বেদনা, স্মৃতি আর বেঁচে থাকার সংগ্রামের প্রতীক।

সম্পর্কিত- মুসলিম রমজান
0%
0%
0%
0%