Advertisement

পরমাণু যুদ্ধের ঝুঁকিতে পাকিস্তান: ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত নিয়ে উদ্বেগের পূর্বাভাস জিয়াংয়ের

পরমাণু যুগে বিশ্ববাসীর জন্য সবচেয়ে ভীতিকর প্রশ্নটি এখন আর কেবল অস্ত্রভাণ্ডারের আকার নিয়ে নয়, বরং সংকটময় মুহূর্তে কে প্রথম ট্রিগারে আঙুল রাখবে—সেটিই বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক জিয়াং শুয়েকিন সম্প্রতি এক পডকাস্ট আলোচনায় এ আশঙ্কার কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, কোনো দেশ যদি প্রথম পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের মতো চরম সিদ্ধান্ত নেয়, তবে সেই তালিকায় ভারত অথবা পাকিস্তানের নাম সবার আগে আসবে; বিশেষ করে পাকিস্তান এই পরিস্থিতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

অধ্যাপক জিয়াং পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ভঙ্গুরতাকে এই ঝুঁকির মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পাকিস্তান কেবল একটি পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র নয়, বরং দেশটি বর্তমানে তীব্র অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমন এক অস্থির রাজনৈতিক কাঠামোয় রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। যদিও জিয়াং মনে করেন যে, বর্তমান পৃথিবীতে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের বিরুদ্ধে একটি সর্বজনীন নিষেধাজ্ঞার মানসিকতা বিদ্যমান থাকায় নিকট ভবিষ্যতে এমন কোনো যুদ্ধের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

বিজ্ঞাপন

ভারত ও পাকিস্তানের কৌশলগত মতবাদে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে, যা এই ঝুঁকিকে আরও স্পষ্ট করে। ভারত দীর্ঘ সময় ধরে ‘প্রথমে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার না করার’ বা নো ফার্স্ট ইউজ নীতি অনুসরণ করে আসছে। অন্যদিকে, পাকিস্তান কৌশলগত অস্পষ্টতা বজায় রেখে এই নীতি থেকে নিজেকে দূরে রেখেছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের কাছে ১৯০টি পরমাণু ওয়ারহেড থাকলেও পাকিস্তানের কাছে থাকা ১৭০টি ওয়ারহেডের তুলনায় ভারতের নীতি অনেকটাই আত্মরক্ষামূলক। জিয়াংয়ের ভাষায়, ভারতের জন্য পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের প্রয়োজন নেই, কিন্তু অস্তিত্ব সংকটে পড়লে পাকিস্তান নিজেকে রক্ষার শেষ হাতিয়ার হিসেবে একে ব্যবহারের কথা ভাবতে পারে।

অতীতে কার্গিল যুদ্ধ থেকে শুরু করে পুলওয়ামা হামলার পরবর্তী উত্তেজনা পর্যন্ত, পাকিস্তান বারবার পরমাণু যুদ্ধের ইঙ্গিত দিয়ে ভারতের ওপর চাপ প্রয়োগের কৌশল গ্রহণ করেছে। সর্বশেষ ২০২৫ সালের মে মাসে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ সরাসরি উল্লেখ করেছিলেন যে, অস্তিত্বের প্রতি সরাসরি হুমকি দেখা দিলে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের পথ খোলা থাকতে পারে। যদিও পরবর্তীতে ভারত ও পাকিস্তান উভয় পক্ষই নিজ নিজ অবস্থানে থেকে শান্তিপূর্ণ অবস্থানের কথা জানিয়েছে, তবুও দক্ষিণ এশিয়ার এই সংবেদনশীল অঞ্চলে উত্তেজনা কমেনি।

বিজ্ঞাপন

পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সাম্প্রতিক কিছু মন্তব্যও আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এক অনুষ্ঠানে দাবি করেছিলেন, পাকিস্তান ধ্বংসের মুখে পড়লে তারা একা ধ্বংস হবে না, বরং বিশ্বের অর্ধেককেও সঙ্গে নিয়ে যাবে। যদিও পাকিস্তান সরকার পরবর্তীতে এই বক্তব্যের তীব্র সংস্করণ অস্বীকার করেছে, তবুও এই ধরনের আস্ফালন দক্ষিণ এশিয়ার পরমাণু রাজনীতিতে ভারতের ওপর যে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে, তা অনস্বীকার্য।

পরিশেষে, জিয়াং শুয়েকিনের পূর্বাভাসটি মূলত দক্ষিণ এশিয়ার সেই কৌশলগত বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে, যেখানে প্রথাগত সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতাকে পাকিস্তান পরমাণু অস্ত্র দিয়ে পূরণ করতে চায়। বিশ্লেষকদের মতে, ভারত-পাকিস্তান সীমান্তের পরিস্থিতি যদি কোনো সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং পাকিস্তানের নেতৃত্ব যদি মনে করে তাদের জাতীয় অস্তিত্ব বিপন্ন, তবেই কেবল এই ভয়ংকর সম্ভাবনাটি বাস্তব রূপ নিতে পারে। যদিও এমন ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা বর্তমানে অতি নগণ্য, তবুও বিশ্বরাজনীতিতে এই ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণটি দীর্ঘমেয়াদী উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তথ্যসূত্র: হিন্দুস্থান টাইমস

0%
0%
0%
0%